Wednesday, 29 December 2010

সিলেট সীমান্তে ভূমি জরিপ : বাংলাদেশের ৫৫ একর জমির মালিকানা দাবি ভারতীয়দের

এটিএম হায়দার, সিলেট

সিলেট সীমান্তে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার ভূমি জরিপ প্রক্রিয়া বিভিন্ন কারণে বিলম্বিত হচ্ছে। গতকাল সোমবার কোথাও জরিপ অনুষ্ঠিত হয়নি। মেঘালয়ে বড়দিনের উত্সব, বাংলাদেশে গত সপ্তাহের ছুটি ছাড়াও মাঠপর্যায়ে সৃষ্ট কিছু সমস্যার কারণে চলতি সপ্তাহে নতুন করে জরিপ কাজ শুরু হচ্ছে না বলে একাধিক সূত্রের সঙ্গে আলাপ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
একটি সূত্র মতে, সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার ডিবির হাওর ও কেন্দ্রীবিলে ৫৫ একর জমি জরিপ শুরু না হতেই ভারতীয়রা সেগুলোর মালিকানা দাবি করে বসেছে। ওদিকে গোয়াইনঘাটের পদুয়ায় ভারতীয়দের হাঙ্গামা সৃষ্টির কারণে সিলেট-মেঘালয় সীমান্তে দুই দেশের মধ্যকার সীমান্ত জরিপের বিষয়টি এখন কিছুটা ঝুলে গেছে। কবে নাগাদ এখানে জরিপ শুরু হবে, সে ব্যাপারে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বাংলাদেশের জরিপ দলে দায়িত্ব পালনরত সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ড. মো. আবুল হাসান বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট জরিপ কাজে উত্থাপন করা হয়েছে। ভারতীয়দের কাছেও তাদের কোনো ডকুমেন্ট থাকলে তা উপস্থাপনের জন্য বলা হয়েছে। কোনো অযৌক্তিক দাবি নিয়ে এলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। তিনি বলেন, মেঘালয়ে ক্রিসমাসের কারণে কয়েক দিন জরিপ বন্ধ রাখার জন্য তারা অনুরোধ জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের ভূমি রেকর্ড সার্ভে কমিশন গত ২৯ নভেম্বর তামাবিল সীমান্তে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জৈন্তাপুর, কানাইঘাট ও গোয়াইনঘাট উপজেলার বিরোধপূর্ণ ভূমির জরিপ শুরুর সিদ্ধান্তে ঐকমত্য হয়। সে মোতাবেক ৭ ডিসেম্বর গোয়াইনঘাট উপজেলা ভূমি অফিসের লোকজন প্রতিপক্ষের লোকজনের সঙ্গে আলাপ করে ৮ ডিসেম্বর মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু করেন। জরিপ চলাকালে জৈন্তাপুরের ডিবিবিলে ভারতীয়রা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভূমির মালিকানা দাবি এবং পদুয়ায় ভারতীয়দের উসকানিমূলক আচরণ জরিপকাজ ব্যাহত করেছে। তবে কানাইঘাটে সমস্যা ছাড়াই জরিপ সম্পন্ন হয়েছে।
গতকাল সোমবার দুই দেশের জরিপ দলের গোয়াইনঘাটের পদুয়া ও জৈন্তাপুরের ডিবির হাওর কেন্দ্রীবিলে জরিপ শুরুর কথা থাকলেও তাদের নির্দিষ্ট জায়গায় যেতে দেখা যায়নি। কী কারণে জরিপ শুরু হচ্ছে না, সে সম্পর্কে বাংলাদেশের বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে আগের সপ্তাহে জরিপ চলাকালে জৈন্তাপুর-মুক্তাপুর সীমান্তে ডিবির হাওর কেন্দ্রীবিলে ৫৫ একর জমি ভারতীয়রা নিজেদের বলে দাবি করায় জরিপ স্থগিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ বিষয়টি উভয় দেশের জরিপ দল নিজ নিজ দেশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছে বলে জানা গেছে। ভারতীয় একটি পত্রিকায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশী নাগরিকদের বাড়াবাড়ির কারণে পদুয়া ও মুক্তাপুরে জরিপ কাজ বিঘ্নিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে সিলেটে ২১ রাইফেলসের ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লে. কর্নেল খায়রুল কাদিরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে বিডিআর বা বাংলাদেশী নাগরিকদের বাধা প্রদানের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তিনি বলেন, বিডিআর জরিপে অংশ নিচ্ছে না। জরিপ দলের সীমান্ত অতিক্রম ও তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি শুধু বিডিআর দেখে আসছে। জৈন্তিয়া শেকড় সন্ধানী গ্রুপের সদস্যসচিব নুরুল ইসলাম বলেন, ভারতীয় নাগরিকদের ‘মামা বাড়ির আবদার’ রক্ষা না হওয়ায় সিলেটে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত জরিপের বিষয়টি স্থগিত হয়ে গেছে। গত ১৪ ডিসেম্বর জরিপ শুরুর আগেই ভারতের মেঘালয়ের মুক্তাপুর থানার লোকজন সমবেত হয়ে বাংলাদেশের ৫৫ একর জমি তাদের বলে দাবি জানাতে থাকে। এমনকি তারা এই জমি তাদের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানায়। বাংলাদেশ জরিপ দল তাদের এই আবদারে সাড়া না দিয়ে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলার থেকে যথারীতি জরিপ পরিচালনায় অনড় মনোভাব দেখায়। ফলে দুই দেশের জরিপ দলের ঐকমত্য না হওয়ায় তা স্থগিত হয়ে যায়। দুই দেশই তাদের ঊর্ধ্বতন মহলে বিষয়টি জানায় বলে ভারতীয় পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে। একটি ভারতীয় পত্রিকায় মুক্তাপুর-জৈন্তাপুর সীমান্তে জরিপ না হওয়ার জন্য সরাসরি বাংলাদেশের বাসিন্দাদের অভিযুক্ত করে। পত্রিকায় বলা হয়, ভারতের ১৩ সদস্যের জরিপ দল জৈন্তিয়া হিল ডিস্ট্রিক্টের মুক্তাপুর থানার কামপ্লিইং নদীতে সার্ভের জন্য বর্তমানে জরিপ শুরুর অপেক্ষা করছে। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
গোয়াইনঘাট উপজেলার প্রতাপপুর-পদুয়ায় দুই দেশের সীমান্ত জরিপে বাংলাদেশ পক্ষে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব ড. মো. আবুল হাসান এবং ভারতীয় মেঘালয়ের জরিপ বিভাগের সহকারী পরিচালক এ সাম পিয়াং জরিপ কাজে নেতৃত্ব দেন। যৌথ জরিপ দল গোয়াইনঘাটের পদুয়ার ১২৭০ নম্বর সীমান্ত পিলার থেকে ১২৭১ নম্বর পিলার পর্যন্ত স্থানে জরিপ পরিচালনা করে। গত ১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর বিএসএফের ছত্রছায়ায় দেড় থেকে দুই শতাধিক ভারতীয় নাগরিক তীর-ধনুক নিয়ে বিরোধপূর্ণ ২৩০ একর জমিতে অবস্থান নিলে সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে। অবশ্য পরদিন পদুয়ার বিডিআর ও বিএসএফ কর্মকর্তাদের পতাকা বৈঠকে দুঃখ প্রকাশ ও জরিপ কাজে সহযোগিতার বিষয়ে ঐকমত্য হলে উত্তেজনা হ্রাস পায়। এদিন পদুয়ায় দুই দেশের সার্ভে দল তাদের নির্ধারিত কাজ পর্যালোচনা করে।
কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়া সীমান্ত বাংলাদেশ ভারতের বিরোধপূর্ণ ভূমির যৌথ জরিপ কাজ কোনো সমস্যা ছাড়া শেষ হয়েছে। এই সীমান্তের ১৩১৮/১ নম্বর মেইন পিলার থেকে বিরোধপূর্ণ ভূমির ওপর বাংলাদেশ ভারতের বিরোধপূর্ণ ভূমির যৌথ জরিপ করা শুরু হয়।
একটি সূত্র মতে, মেঘালয়ের খাসিয়ারা খ্রিস্টান ধর্মালম্বী হওয়ায় আগামী ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনকে কেন্দ্র করে সেখানে উত্সবের আমেজ চলছে। সে কারণে জরিপ কাজ বিলম্বিত হচ্ছে। দুই দেশের আগের নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী ৩১ ডিসেম্বর জরিপ শেষ হওয়ার কথা। তবে ভারতীয় একটি পত্রিকায় বলা হয়, জরিপ কাজ ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে।
উল্লেখ্য, গত এক বছর বিএসএফ পদুয়া থেকে শ্রীপুর পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার সীমান্তে একাধিকবার উসকানিমূলক ঘটনা ঘটায়। বিএসএফের সহযোগিতায় ভারতীয় নাগরিকরা বাংলাদেশের জমি থেকে ধান কেটে নেয় এবং গরু ধরে নিয়ে যায়। বিভিন্ন মহল থেকে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে অন্তত যৌথ জরিপের দাবি ওঠানো হলে গত ১২ জানুয়ারি দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষরিত হয়। ঘোষণায় ১৯৭৪ সালের সীমান্ত চুক্তি দু’পক্ষই মেনে চলবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি সীমানা চিহ্নিতকরণের জন্য জয়েন্ট বর্ডার ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেবিডাব্লিউজি) সক্রিয় করা হয়। গত ২৯ নভেম্বর তামাবিল আইসিপিতে উভয় দেশের ভূমি সার্ভে কমিশনের যৌথ বৈঠকে ৭ ডিসেম্বর থেকে গোয়াইনঘাট-জৈন্তাপুর-কানাইঘাট সীমান্তের বিরোধপূর্ণ ভূমি জরিপের সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী সিলেটের তিন উপজেলায় গত ৮ ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশ-ভারত বিরোধপূর্ণ ভূমির যৌথ জরিপের প্রারম্ভিক কাজ শুরু হয়।

No comments:

Post a Comment