Tuesday, 26 April 2011

পানি আগ্রাসনের শিকার বাংলাদেশ

আলাউদ্দিন আরিফ

বিশ্বের সর্ববৃহত্ মরুভূমি সাহারা একসময় ছিল ছোট ছোট নদী ও হ্রদবিশিষ্ট শস্যশ্যামল প্রান্তর। রোমান সাম্রাজ্যের শস্যভাণ্ডার ছিল এই সাহারা অঞ্চল। কিন্তু লোনা পানির আগ্রাসনে সাহারা আজ বিশ্বের বৃহত্তম মরুভূমি। ভারত আগ্রাসন চালিয়ে মিঠা পানি প্রত্যাহার অব্যাহত রাখলে এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা লোনা পানির অবাধ বিস্তার দূরভবিষ্যতের কোনো একসময়ে বাংলাদেশকেও সাহারা মরুভূমির ভাগ্যবরণ করতে হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভারতের একতরফা পানি আগ্রাসনের শিকার হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদীর ৪২টিতে বাঁধ দিয়েছে ভারত। এসব বাঁধের ফলে লবণাক্ততা বাড়ায় এখনই ২০ ভাগ জমি অনাবাদি থাকছে এবং আরও ৩০ ভাগ জমিতে ফসল উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের আওতায় ভারত আসামের ধুবরী এলাকায় ব্যারাজ নির্মাণ করে ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রত্যাহারের পরিকল্পনা নিয়েছে। ফারাক্কা বাঁধ ও আন্তঃনদী অববাহিকা সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত গ্রীষ্ম ও বর্ষা উভয় মৌসুমে গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের পরিকল্পনা নিয়েছে। মেঘনার উজানে বরাক নদীতে কার্যকর করছে টিপাইমুখ বাঁধ ও ফুলেরতল ব্যারাজ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের নদীমাতৃক পরিচয়টুকুও শুধু হারিয়ে যাবে না, পরিণত হবে মরুভূমিতে।
ভূ-প্রকৃতিগতভাবে বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ অঞ্চল। এর তিন দিকে ভারত ও মিয়ানমার আর একদিকে বঙ্গোপসাগর। বঙ্গোপসাগরের জোয়ার-ভাটার টানে সাগর থেকে ঊঠে আসে লোনা পানি। এই লোনা পানিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আসা প্রতিরোধ করে উজান থেকে আসা নদ-নদীগুলোর মিঠা পানি। বাংলাদেশের প্রায় সব নদ-নদীর পানিপ্রবাহের মূল উত্স সীমান্ত নদী।
দক্ষিণ-পূর্ব পাহাড়ি অববাহিকা বাদে গঙ্গা-পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা এই তিন নদীর অববাহিকায় বাংলাদেশের অবস্থান। ভারতের একতরফা পানি আগ্রাসনে দেশের সব কয়টি অববাহিকার নদ-নদীগুলো শুকিয়ে পরিণত হয়েছে মরাগাঙে। শুকনো মৌসুমে দেশের উত্তর, পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোকে মনে হয় প্রকৃতির ক্ষতচিহ্ন। এগুলোতে এখন চাষ হয় ধান, গম, আখ ও কলাসহ নানা ফসলের। দক্ষিণের নদীগুলোতে জোয়ারে পানি আসে, ভাটায় নামে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের পানিবিজ্ঞান জুন ২০০৫-এ প্রকাশিত সমীক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে নদ-নদীর সংখ্যা ৩১০টি। এর মধ্যে অভিন্ন নদী (আন্তর্জাতিক) ৫৭টি। আন্তর্জাতিক নদীগুলোর ৫৪টি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ভারত থেকে, আর ৩টি এসেছে মিয়ানমার থেকে।
সাতক্ষীরা সীমান্ত থেকে রাজশাহী, পঞ্চগড়, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম হয়ে শেরপুর সীমান্ত পর্যন্ত অভিন্ন নদীগুলোর মধ্যে ব্রহ্মপুত্র বাদে সব কয়টি নদীতে বাঁধ দিয়ে একতরফা পানি প্রত্যাহার চলছে। এই অভিন্ন নদীগুলো হচ্ছে রায়মঙ্গল, ইছামতি-কালিন্দি, বেতনা-কোদালিয়া, ভৈরব-কোবাদাক (কপতাক্ষ), মাথাভাঙা, গঙ্গা, পাগলা, আত্রাই, পুনর্ভবা, তেঁতুলিয়া, ট্যাঙ্গন, কুলীক, নাগর, মহানন্দা, ডাহুক, করতোয়া, তালমা, ঘোড়ামারা, দেওনাই-চাড়ালকাটা-যুমেনেশ্বরী, বুড়িতিস্তা, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, জিঞ্জিরাম, চিতলখালী, ভোগাই, নিতাই, সুমেশ্বরী, যাদুকাটা রক্তি নদী। নেত্রকোনা থেকে সুনামগঞ্জ, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা সুরমা ও কুশিয়ারার মূল নদী বরাক বাদে সব কয়টি নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নেয়া হচ্ছে। এই এলাকা দিয়ে আসা নদী জালুয়াখালী, ধামালিয়া, নয়াগাং, উমিয়াম, ধলা, পিয়াইন, সারি গোয়াইন, সোনাই বরদল, জুরি, মনু, ধলাই, গোপাল-লংলা, খোয়াই, সুতাং, সোনাই, হাওরা, বিজনী, সালদা, গোমতী, কাকরি-ডাকাতিয়া ও সোলোনিয়ায় বাঁধ ও স্লুইচগেট নির্মাণ করে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেয়া হচ্ছে। টিপাইমুখ বাঁধ ও ফুলেরতল ব্যারাজ সম্পন্ন হলে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ ও একতরফাভাবে প্রত্যাহারের সুযোগ পাবে ভারত। মুহুরী ও ফেনী নদীতে বাঁধ দেয়া না হলেও বড় বড় পাম্প বসিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নেয়া হচ্ছে। মিয়ানমারের সঙ্গে তিনটি নদী হচ্ছে সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও নাফে কোনো বাঁধ নির্মাণের খবর এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
এসব বাঁধের কারণে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে ভাটির বাংলাদেশে। অধিকাংশ সীমান্ত নদীর উজানে বাধার কারণে শুকনো মৌসুমে প্রবাহবিহীন হয়ে পড়ে অধিকাংশ নদী। বর্ষায় স্লুইসগেটগুলো খুলে দিলেই দুই কূল ছাপিয়ে বন্যা ও ঢল দেখা দেয়।
ভারতের পানি আগ্রাসনের বড় একটি নমুনা ফারাক্কা বাঁধ। ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল আস্তে আস্তে মরুময়তার দিকে চলে যাচ্ছে। রাজশাহীর গোদাগাড়ীর পশ্চিম প্রান্তে যেখানে পদ্মা-মহানন্দা মিলিত হয়েছে সেখান থেকে রাজশাহী শহর, চারঘাট হয়ে হার্ডিঞ্জ সেতু পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে বিশাল বিশাল বালুচর। পদ্মা তীরবর্তী মানুষ জানায়, গত বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি ছিল মাত্র কয়েকদিন। তারপর থেকে চর জাগতে শুরু করে এবং এখন পদ্মাজুড়ে শুধু ধু-ধু বালুর চর আর চর। পানি সঙ্কটের কারণে প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের সর্ববৃহত্ গড়াই কপতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প।
গত ৩৮ বছরে এ প্রবাহ শুধু কমেছে। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের সঙ্গে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি হয়। কিন্তু এতে তেমন কোনো সুফল আসেনি। যদিও যৌথ নদী কমিশন বরাবরই বলছে বাংলাদেশ চুক্তি অনুযায়ী পানি পাচ্ছে। চলতি মার্চের প্রথম ২০ দিনে বাংলাদেশ চুক্তি অনুযায়ী ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানি পেয়েছে বলে যৌথ নদী কমিশন জানিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের চোখের সামনেই বড়াল, মরা বড়াল, নারদ, মুছাখান, ইছামতি, ধলাই, হুড়াসাগর, চিকনাই, নাগর, গড়াই, মাথাভাঙা, ভৈরব, নবগঙ্গা, চিত্রা, বেতাগ, কালীকুমার, হরিহর, কালীগঙ্গা, কাজলা, হিসনা, সাগরখালী, চন্দনা, কপোতাক্ষ, বেলবাত নদী দিনে দিনে মরাগাঙে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এরই মধ্যে ১৩টি নদীর অস্তিত্ব বিলীনের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের হিসাবে রায়মঙ্গল, কালিন্দি, বেতনা-কোদালিয়া, পাগলা, ট্যাঙ্গন, কুলিক, তেঁতুলিয়া, ঘোড়ামারা, তালমা, দেওনাই, চিনাখালী, কোনী, সালদা, বিজনী, হাওড়া, সোনাই, সুতাং, খোয়াই, লংগলা, ধলাই, মনু, জুরি, সোনাইবড়দাল, নিতাই ও ভোগাই নদীর অস্তিত্ব সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করে বাংলাদেশের অন্যতম নদী তিস্তা ও বুড়ি তিস্তার পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে ভারত। তিস্তা ব্যারাজের ভাগ্য ঝুলে গেছে গজলডোবায়। সেখান থেকে চুইয়ে চুইয়ে বা উদ্বৃত্ত হিসেবে যে পানি আসে তা দিয়েই চলে তিস্তা ব্যারাজ।
পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, শুষ্ক মৌসুমে দেশের পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলে পানির অভাবে নদীগুলো যখন মরা গাঙ, নদীর বুকে ধু-ধু বালুচর, পাম্প বসিয়েও পানি তোলা সম্ভব হয় না; ঠিক ওই সময় সিলেট অঞ্চলে দেখা দিচ্ছে অকাল বন্যা। উজান থেকে নেমে আসা আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে প্রতি বছরই হাজার হাজার একর জমির ফসল ধ্বংস হয়।
মেঘনায় পানি প্রবাহের মূল উত্স বরাক নদী। সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার অমলসীদ সীমান্তে বরাক দুটি স্রোতে ভাগ হয়ে সুরমা-কুশিয়ারা নাম নিয়েছে। অমলসীদের ১০০ কিলোমিটার উজানে মণিপুর রাজ্যের টিপাইমুখ নামক স্থানে বরাক নদীতে বাঁধ নির্মাণ প্রায় সম্পন্ন করে এনেছে ভারত। টিপাইমুখে ১৬৩ মিটার উঁচু বাঁধ তৈরি করে বরাক ও তার উপনদীগুলোর মিলিত প্রবাহের গতিরোধ করে ৩০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের জলাধার তৈরি করা হবে। টিপাইমুখ বাঁধের ভাটিতে আসামের কাছার জেলার ফুলেরতল নামক স্থানে একটি বড় বাঁধ তৈরি করে বরাক নদীর পানি অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ফলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মোহাম্মদ আকতারুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, পানি আগ্রাসনের ফলে মহাবিপর্যয়ে পড়বে বাংলাদেশ। একসময়কার শস্যশ্যামল সাহারা অঞ্চল যেভাবে লোনা পানির আগ্রাসনে মরুভূমি হয়েছে তেমনি দূরভবিষ্যতে বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ডেও ওই ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তিনি বলেন, ফারাক্কার ফলে দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, মহানন্দা ও করতোয়া বাঁধের ফলে দেশের উত্তরাঞ্চলে মরুকরণ শুরু হয়েছে। টিপাইমুখ বাঁধ চালুর প্রথম পর্যায়ে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ১৬ জেলায় মরুকরণ শুরু হবে। টিপাইমুখ বাঁধের ফলে ৪ থেকে ৫ কোটির বেশি মানুষ বিপর্যস্ত হবে। এইসঙ্গে ফারাক্কা বাঁধ এবং গঙ্গার উজানে আন্তঃনদী পানি স্থানান্তর প্রকল্পের প্রভাব একত্রিত করলে বাংলাদেশের ৬০ ভাগ এলাকা মরুভূমিতে পরিণত হবে।
বিশিষ্ট পানিবিজ্ঞানী জাতিসংঘের সাবেক ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যানার ড. এসআই খান বলেন, ভারতের অংশে ব্রহ্মপুত্রের প্রায় সব কয়টি উপনদীতে বাঁধ ও ব্যারাজ নির্মাণ করেছে ভারত। গঙ্গার উপনদীগুলোতেও বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। গঙ্গা, তিস্তা, গোমতী, ধরলা, দুধকুমারসহ অন্যসব অভিন্ন নদী থেকে ভারত পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় বিপর্যয় নেমে এসেছে ভাটির বাংলাদেশে।
বাংলাদেশকে বাঁচাতে প্রধান ৩টি নদী অববাহিকার উপনদী ও শাখানদী নিয়ে আলাদা ৩টি কমিশন গঠনের প্রস্তাব করেন ড. এসআই খান। তিনি বলেন, গঙ্গা ও এর উপনদীগুলো নিয়ে নেপাল, ভারত, বাংলাদেশ ও চীনের সঙ্গে একটি কমিশন, ব্রহ্মপুত্রের পানি বিষয়ে চীন, ভারত, ভুটান ও বাংলাদেশ এবং মেঘনার পানি বিষয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আলাদা কমিশন গঠন করা যেতে পারে। এসব কমিশন কার্যকর করার জন্য জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংককে নিশ্চয়তা বিধানকারী (গ্যারান্টার) হিসেবে রাখতে হবে। বিশ্বের কার্যকর অন্য নদী কমিশনগুলোর আলোকে আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী প্রধান ৩ নদীর অববাহিকাভিত্তিক ৩টি কমিশন গঠন ও এগুলো কার্যকর করা গেলে বাংলাদেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে অনেকটা রক্ষা পাবে। বেঁচে যাবে বাংলাদেশের নদীগুলো। এর মাধ্যমে ভারত, নেপাল ও চীন সবাই লাভবান হবে

No comments:

Post a Comment