Sunday, 1 January 2012

ইনশাল্লাহ বলায় জিএমজি’র এয়ার হোস্টেসকে ক্ষমা চাইতে হলো













কাদের গনি চৌধুরী
বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থা জিএমজি এয়ারলাইন্সে ‘ইনশাল্লাহ’ ও ভ্রমণের দোয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ‘ইনশাল্লাহ’ বলায় সিনিয়র এক এয়ার হোস্টেসের চাকরি যায় যায় অবস্থা। ওই এয়ার হোস্টেসকে এর জন্য শোকজ করা হয়েছে। লিখিতভাবে ক্ষমা চেয়ে তিনি চাকরিচ্যুতি থেকে আপাতত রক্ষা পেয়েছেন। অন্যদেরও চিঠি দিয়ে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন জিএমজির ভারতীয় কর্মকর্তা এওয়ার্ড একলেসটন। এদিকে ‘ইনশাল্লাহ’ ও ভ্রমণের দোয়া নিষিদ্ধ হওয়ায় বাংলাদেশী যাত্রীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
জিএমজি এয়ারলাইন্সের একটি সূত্র জানায়, নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি থেকে জিএমজির সব ফ্লাইটে ‘ইনশাল্লাহ’ এবং ভ্রমণের দোয়া ‘বিসমিল্লাহে মাজরেহা ওয়া মুরসাহা ইন্না রাব্বিলা গাফুরুর রাহিম’ পাঠ নিষিদ্ধ করা হয়। এর আগে অন্যান্য এয়ারলাইন্সের মতো জিএমজির ফ্লাইট যাত্রা শুরু এবং ল্যান্ড করার আগে ভ্রমণের দোয়া ও ‘ইনশাল্লাহ অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা যাত্রা শুরু করছি’ এসব ঘোষণা থাকত। কিন্তু একচেটিয়া ভারতীয় কর্মকর্তা নিয়োগের পর আল্লাহর নামে যাত্রা শুরু করার ঘোষণা নিষিদ্ধ করার মতো ধৃষ্টতা দেখালো জিএমজি। ফলে শুধু যাত্রীই নয়, তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে জিএমজির বাংলাদেশী অফিসারদের মধ্যেও।
এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১৭ নভেম্বর দুবাই থেকে জিএমজির একটি ফ্লাইট ঢাকায় আসছিল। ওই ফ্লাইটের ঘোষণার দায়িত্বে ছিলেন পার্সার সাবেরা ফেরদৌসী। বরাবরের মতো তিনি ওইদিনও ঘোষণা করেন ‘ইনশাল্লাহ’ অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা ঢাকা হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করব। ওই ফ্লাইটে ছিলেন জিএমজির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার ভারতীয় নাগরিক এওয়ার্ড একলেসটন। এ ঘোষণা শোনার পর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন তিনি। ঢাকায় ফিরে ১ ডিসেম্বর তিনি শোকজ করেন পার্সার সাবেরা ফেরদৌসীকে। শোকজ লেটারে বলা হয়, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার মারুফা মাহফুজ আপনাকে আপডেট ঘোষণা ব্রিফ করার পরও আপনি আগের ঘোষণা পাঠ করেছেন। এতে আপনার উদাসীনতার প্রমাণ মেলে যা শৃঙ্খলাভঙ্গজনিত অপরাধ।
অবশ্য চিঠিতে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে অতীতের ভালো পারফরম্যান্সের জন্য সতর্ক করে দেয়া হয়। ১৮ ডিসেম্বর শোকজের জবাব দেন সাবেরা ফেরদৌসী। জবাবে তিনি তার ঘোষণায় আগের মতো ইনশাল্লাহ বলায় আন্তরিকভাবে ক্ষমা চান। তিনি এ ধরনের ভুল আর করবেন না বলেও অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
শুধু সাবেরা ফেরদৌসীই নন, আরও বেশ ক’জন এয়ার হোস্টেসকে ইনশাল্লাহ বলায় জিএমজি কর্তৃপক্ষের বকুনি খেতে হয়েছে। জিএমজির ট্রেনিং ইনস্ট্রাকটর ফারহানা জুলি ঘোষণায় যেন ‘ইনশাল্লাহ’ ও ভ্রমণের দোয়া পাঠ করা না হয়, সেজন্য সব কেবিন ক্রুকে মেসেজ পাঠিয়েছেন।
এ ব্যাপারে ট্রেনিং ইনস্ট্রাকটর ফারহানা জুলির কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুধু কলকাতার ফ্লাইটের ক্ষেত্রে এ নিয়ম করা হয়েছে, অন্য ফ্লাইটে ঠিক আছে। কলকাতা যেতে অল্প সময় লাগে, তাই এত বড় ঘোষণা দিলে অনেকে বিরক্ত হন। তাহলে দুবাই থেকে আসা ফ্লাইটে ‘ইনশাল্লাহ’ ও ভ্রমণের দোয়া পাঠ করায় কেন শোকজ করা হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি ঠিক নয়। সাবেরা ফেরদৌসী গতকালও ফ্লাই করেছেন। আপনার কথা শুনে আমি আশ্চর্য হচ্ছি।
জিএমজির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার এওয়ার্ড একলেসটন এবং পার্সার সাবেরা ফেরদৌসীর বক্তব্য জানার জন্য ফোন করে তাদের পাওয়া যায়নি।
বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থা জিএমজি এয়ারলাইন্স লিমিটেডের শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখল করে আছে ভারতীয়রা। ফলে বাংলাদেশী দক্ষ কর্মকর্তারা বেকার ও পদোন্নতিবঞ্চিত হচ্ছেন। জিএমজির একটি সূত্র জানায়, শীর্ষ ১৬ পদের মধ্যে ৯টি পদই ভারতীয়দের দখলে। বাকি দুটিতে আমেরিকান, একটিতে ব্রিটিশ, একটিতে শ্রীলঙ্কান, একটিতে ফিলিপিনো এবং দুটিতে বাংলাদেশী কর্মকর্তা রয়েছেন। এসব বিদেশি কর্মকর্তাদের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে জিএমজি এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষকে। আর এভাবে দেশের অর্থ চলে যাচ্ছে বিদেশে।
জিএমজির প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ করছেন ভারতীয় নাগরিক সঞ্জীব কাপুর। এখানে দায়িত্বভার গ্রহণ করার আগে তিনি ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান বেইন অ্যান্ড কোম্পানিতে কাজ করেছেন। এর আগে তিনি তেমাসেক হোল্ডিংসের (সিঙ্গাপুর) ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড পোর্টফোলিওর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্ট এয়ারলাইন্সে স্ট্র্যাটেজি, ফাইন্যান্স অ্যান্ড অপারেশন্সের পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ডাইরেক্টর কমার্শিয়াল হিসেবে জিএমজি নিয়োগ করেছে ভারতীয় নাগরিক শিল্পা ভাটিয়াকে। কমার্শিয়াল বিষয়ে শিল্পার অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তাকে লোভনীয় বেতনে চাকরি দেয় জিএমজি। এছাড়া ডাইরেক্টর ইঞ্জিনিয়ারিং হিসেবে ভারতীয় নাগরিক বারিন ঘোষ দাস্তিদার, ডাইরেক্টর গ্রাউন্ড সার্ভিস পদে শাইলেস শর্মা, সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার কেবিন সার্ভিস পদে এওয়ার্ড একলেসটন, সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার ক্যাটারিং পদে রাজিব ঘাই, সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার অপারেশন্স নাইডু, এজিএম অপারেশন্স বন্দনা, ডাইরেক্টর সেফটি পদে আরএল কাপুরকে নিয়োগ দিয়েছে জিএমজি। এদের মধ্যে সত্তরোর্ধ্ব আরএল কাপুর ভারতে চাকরি জীবন শেষে অবসর কাটাচ্ছিলেন। তাকে মোটা বেতনে চাকরি দেয় জিএমজি। এওয়ার্ড একলেসটনকে জিএমজি ৭ হাজার ডলার অর্থাত্ বাংলাদেশী টাকায় প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা বেতন দিচ্ছেন। অথচ জিএমজিতে চাকরির আগে তিনি জেড এয়ারওয়েজের কলকাতা অফিসের রিক্রুটার ছিলেন। কেবিন সার্ভিসে পূর্বঅভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তাকে সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার কেবিন সার্ভিস পদে নিয়োগ দেয় সংস্থাটি।
জিএমজির দ্বিতীয় প্রধান পদ চিফ অপারেটিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে ব্রিটিশ নাগরিক ডেভিডকে। ডাইরেক্টর ফ্লাইট অপারেটর (ডিএফও) পদে আমেরিকান নাগরিক জ্যাক একেল ও জেনারেল ম্যানেজার প্ল্যানিং পদে জেনিস, জেনারেল ম্যানেজার কোয়ালিটি পদে ফিলিপিনো ডার্ক এবং জিএম কার্গো পদে শ্রীলঙ্কান অরুণাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, বিদেশি কর্মকর্তারা একজোট হয়ে যে ক’জন বাংলাদেশী কর্মকর্তা রয়েছেন, তাদের কোণঠাসা করে রেখেছেন। তারা কর্তৃপক্ষকে সবসময় বাংলাদেশীদের বিরুদ্ধে ভুল বোঝান। সূত্র জানায়, বোয়িং ৭৬৭-এর জন্য ৮ জন বাংলাদেশী পাইলট সুইডেন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসেন ৪ সেপ্টেম্বর। নিয়ম অনুযায়ী এরপর তাদের বাংলাদেশ লাইনে প্রশিক্ষণ নিতে হয়। অথচ ডিএফও জ্যাক এই ট্রেনিং স্লো চালিয়ে তাদের কাজে যোগদান থেকে দূরে রাখছেন। সূত্র জানায়, বিদেশি পাইলটদের দিয়ে এয়ারক্রাফট চালানোর জন্য তিনি এমন চাতুরির আশ্রয় নিয়েছেন। এতে দেশের প্রচুর অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। সূত্র জানায়, বাংলাদেশী একজন পাইলটকে যেখানে ৫ হাজার ডলার বেতন দেয়া হয়, সেখানে বিদেশি একজন পাইলটকে দিতে হয় ১৪ হাজার ডলার।
বাংলাদেশের বৃহত্তম ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বেক্সিমকোর মালিকানাধীন কোম্পানি জিএমজি এয়ারলাইন্স ১৯৯৮ সালের ৬ এপ্রিল বাণিজ্যিকভাবে যাত্রা শুরু করে। অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করলেও ২০০৪-এর ৬ এপ্রিল চট্টগ্রাম-কলকাতা রুটে ফ্লাইট পরিচালনার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বিমান আকাশে পদচারণা শুরু হয় জিএমজির। আটটি আন্তর্জাতিক এবং পাঁচটি অভ্যন্তরীণ রুটে সপ্তাহে ২৩৪টি ফ্লাইট পরিচালনা করছে জিএমজি এয়ারলাইন্স। জিএমজি আন্তর্জাতিক রুট কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক, কাঠমান্ডু, কলকাতা, দুবাই, আবুধাবি, জেদ্দা ও রিয়াদ এবং অভ্যন্তরীণ রুটে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট এবং যশোরে তাদের ফ্লাইট পরিচালনা করে থাকে। জিএমজি বর্তমানে তিনটি বোয়িং ৭৬৭ ও তিনটি ম্যাকডগলাস এয়ারক্রাফট আঞ্চলিক রুটে এবং তিনটি কানাডিয়ান বোম্বার্ডিয়ার ড্যাশ-৮ দিয়ে অভ্যন্তরীণ ও কলকাতা রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। তবে কিছুদিন ধরে কয়েকটি আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ রেখেছে তারা।
সূত্র জানায়, বিদেশিদের মোটা অংকের বেতন দিতে গিয়ে এবং পরিকল্পনার অভাবে জিএমজির আর্থিক অবস্থান বর্তমানে ভালো নয়। ফ্লাইটের আকারও কমে গেছে। এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে দুবাই, আবুধাবি, রিয়াদ ও জেদ্দা রুটের ফ্লাইট।

No comments:

Post a Comment