Tuesday, 17 August 2010

ভারতকে ট্রানজিট দিতে অসম্ভব দ্রুততায় প্রকল্প অনুমোদন : বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন

জাহেদ চৌধুরী
ভারতকে সড়ক, রেল, নৌপথে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা নিশ্চিত করতে খুবই দ্রুততার সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্প অনুমোদন করছে সরকার। গত জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় দু’দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ৫০ দফা সমঝোতা স্মারকের আলোকে শিগগিরই বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষর করবে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং এ লক্ষ্যে শিগগিরই বাংলাদেশ সফরে আসবেন। এ মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরের সময় দু’দেশের মধ্যে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের একশ’ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভারতের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের স্বাক্ষরিত এই ঋণচুক্তির শর্ত এবং উদ্দেশ্য নিয়ে এরই মধ্যে বাংলাদেশে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ভারতের এক্সিম ব্যাংকের নিজস্ব ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ভারত সরকারের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষা করেই এরা বিভিন্ন দেশকে ঋণ দিয়ে থাকে। ঋণচুক্তির মাধ্যমে যে টাকা ধার হিসেবে পাওয়া যাবে তা চড়া সুদ ও কঠিন শর্তে মূলত ভারতের ট্রানজিট সুবিধা নিশ্চিত করতেই ব্যবহৃত হবে। প্রণব মুখার্জির সফরের সময়ই ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফর নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তার সফরের আগেই বাংলাদেশ ট্রানজিট সুবিধার কাজটি এগিয়ে নিতে চায়।
ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের দশ দিনেই মধ্যেই গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে একনেকের বৈঠকে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার ভারত সংশ্লিষ্ট প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নৌপথ ড্রেজিংয়ের জন্য প্রায় ২১শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬টি ড্রেজার কেনা এবং ভারত থেকে বিদ্যুত্ আমদানির লক্ষ্যে বিদ্যুত্ সঞ্চালন লাইন স্থাপনের জন্য এক হাজার ৭৯ কোটি টাকার প্রকল্প। প্রধানমন্ত্রী দ্রুত এসব ড্রেজার সংগ্রহ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান পরিকল্পনা সচিব হাবিব উল্লাহ মজুমদার। এর আগেই প্রণব মুখার্জির সফর শেষ হওয়ার চারদিনের মাথায় গত বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বেনাপোল স্থলবন্দর এবং শুক্রবার মংলা সমুদ্রবন্দর পরিদর্শন করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি সফরকালে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার করে ভারতকে তাদের পণ্য নিজ দেশে নিয়ে যেতে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা দেয়ার কথা ঘোষণা করেন। ভারত চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর আমদানি-রফতানির জন্য নিজ দেশে অবকাঠামো নির্মাণের কাজ অনেকদূর এগিয়ে নিয়েছে। এজন্য ত্রিপুরার সর্বদক্ষিণে অবস্থিত সাবব্রুম পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়ক নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছে এবং একইসঙ্গে সাবব্রুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের কাজও চলছে। বাংলাদেশ এই রুটে ভারতের ট্রানজিট সুবিধা নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে ফেনী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের অনুমতি সে দেশকে দিয়েছে। এ সেতু নির্মিত হলে সাবব্রুমের সঙ্গে রামগড়ের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। সাবব্রুম থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের দূরত্ব মাত্র ৭৫ কিলোমিটার। এদিকে আখাউড়ায় পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরের কাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে। ভারত তাদের ওডিসি (পণ্যবাহী বড় আকারে কন্টেইনার) পরিবহনের জন্য এ বন্দর ব্যবহার করবে।
এর আগে গত বছর সেপ্টেম্বরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি দিল্লি সফরে গেলে ভারতের ত্রিপুরার পালাতানায় ৭২৬ মেগাওয়াটের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য পশ্চিমবঙ্গ থেকে আশুগঞ্জ নদীবন্দর হয়ে ওডিসি পরিবহনের জন্য আশুগঞ্জ-আখাউড়া সড়কে ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার বাংলাদেশের সম্মতির কথা জানান। এজন্য আশুগঞ্জ নদীবন্দরকে ‘পোর্ট অব কল’ ঘোষণাসহ প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেয়া হলেও বাংলাদেশের অবকাঠামো এখনও ওডিসি পরিবহনের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়নি। ভারত ও বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল এরই মধ্যে দু’দফায় আশুগঞ্জ থেকে আখাউড়া পর্যন্ত সড়ক সরেজমিন পরিদর্শন করে অবকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন দিক চিহ্নিত করেছে। বিদ্যুত্ কেন্দ্রের জন্য ভারত প্রায় ১০০টি ওডিসি বার্জে করে আশুগঞ্জ নৌবন্দরে আনবে। সেখান থেকে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে সড়কপথে আখাউড়ায় নেয়া হবে। আখাউড়া থেকে রেলযোগে ত্রিপুরার পালাতানায় নেয়া হবে। এজন্য আখাউড়া জংশনে দুই কিলোমিটার আগে বা পরে ত্রিপুরা সীমান্তের সঙ্গে রেল সংযোগ স্থাপনের কাজও এগিয়ে চলছে। ওডিসিগুলোর বেশিরভাগই ওজন ১০০ থেকে ২০০ টনের মধ্যে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৫২ টনের দুটি যন্ত্র রয়েছে। এ দুটি লম্বায় ৩০ মিটার, পাশে ৬ মিটার ও উচ্চতায় ৮ মিটার। বাংলাদেশের রাস্তায় সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ১৯ মিটার বা ৪০ ফুট কন্টেইনার নিয়ে ট্রেলার চলাচল করে। তাও আবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মতো অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত রাস্তায়। ওডিসি পরিবহনে সময়ের প্রয়োজন হবে এক থেকে দেড় বছর।
ওদিকে বিদ্যুতের আন্তঃদেশীয় গ্রিড লাইন স্থাপন প্রকল্পের অধীন বাংলাদেশ অংশে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ও ভারত অংশে আরও প্রায় ৮০ কিলোমিটার গ্রিড লাইন স্থাপন করতে হবে। পুরো খরচ বাংলাদেশকেই বহন করতে হবে। ভারতীয় অংশের গ্রিড লাইন স্থাপনের টাকাটি বাংলাদেশ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের কাজ থেকে ঋণ নিয়ে করছে। অর্থাত্ বাংলাদেশী টাকায় ভারতের ভেতর গ্রিড লাইন স্থাপন হবে। এ রকম অভূতপূর্ব শর্তের গ্রিড লাইন স্থাপন নিয়ে সাবেক উপদেষ্টা ও কেবিনেট সচিব আকবর আলি খান প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, এই আড়াইশ’ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ আমদানির কথা বলে এ ধরনের ব্যয়বহুল প্রকল্প গ্রহণের কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। এ টাকা দিয়ে প্রায় দেড়শ’ মেগাওয়াটের বিদ্যুত্ প্লান্ট বাংলাদেশের ভেতরেই এই সময়ের মধ্যে স্থাপন করা যেত। ভারতের কাছ থেকে এক দশমিক ৭৫ ভাগ সুদ ও দশমিক ৫০ ভাগ কমিটমেন্ট সুদে নেয়া ঋণের টাকায় এরই মধ্যে চিহ্নিত ১৪টি ছোট-বড় প্রকল্পের বাংলাদেশী স্বার্থ নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। ড. আকবর আলি খান বলেছেন, এর মধ্যে প্রায় ৩শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে আশুগঞ্জে স্থাপিতব্য টার্মিনাল, প্রায় ২শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে আশুগঞ্জ থেকে আখাউড়া হয়ে ভারত পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার, সাবব্রুম-রামগড় সড়ক সংস্কারে প্রায় ২শ’ কোটি টাকা ব্যয়ের কোনো প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশের নেই। এগুলো স্রেফ ভারতের কাজে লাগে। এসব বন্দর ও সড়ক দিয়ে বাংলাদেশের কোনো লাভ হবে না।
ভারতের ত্রিপুরায় বিদ্যুত্ প্রকল্প নির্মাণে বাংলাদেশের আশুগঞ্জ বন্দর দিয়ে এক একটি ২শ’ টন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ওজনের বড় আকারের ওডিসি কনটেইনার পরিবহন নিশ্চিত করতে হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলতে হবে। ওডিসি পরিবহনের সময় এ সড়ক দিয়ে অন্য যান চলাচল করতে পারবে না। বাংলাদেশের রাস্তায় যেখানে ৫ থেকে ২০ টন ওজনের কনটেইনার পরিবাহিত হয়ে থাকে, সেখানে এত বড় আকারের কনটেইনার পরিবহনে সড়কের বর্তমান অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে বাংলাদেশ যে ক্ষতির সম্মুখীন হবে, তার বিপরীতে বাংলাদেশ খুব সামান্যই শুল্ক পাবে। আর্থিক দিকটি নিশ্চিত না করেই বাংলাদেশ ভারতকে এ জাতীয় সুবিধা প্রদানে রাজি হয়েছে।
ভারতীয় ঋণের টাকায় ৬টি ড্রেজার কেনা ও হাজার কোটি টাকার বিদ্যুত্ গ্রিড প্রকল্প একনেকে অনুমোদন : ভারতের দেয়া ঋণের অর্থে প্রথম প্রকল্প অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রকল্পের আওতায় দেশের নদী খননের জন্য ৬টি ড্রেজার কিনতে ভারতীয় ঋণের ৪৭২ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। গতকাল শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে একনেক সভায় এ সংক্রান্ত প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। সভাশেষে পরিকল্পনা সচিব হাবিবুল্লাহ মজুমদার সাংবাদিকদের জানান, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬টি ড্রেজার কিনতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৩৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভারতীয় ঋণ সহায়তার বাইরে ১৬৭ কোটি টাকার জোগান দেবে বাংলাদেশ সরকার। ড্রেজারগুলোর মধ্যে একটি মংলা বন্দরের জন্য, তিনটি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং দুটি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের জন্য।
পরিকল্পনা সচিব জানান, ২০১২ সালের জুলাইয়ের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে। তবে ড্রেজারগুলো কোন কোন নদীর খনন কাজে ব্যবহার করা হবে, তা জানাতে পারেননি তিনি।
গত ৭ আগস্ট ভারতের সঙ্গে একশ’ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা চুক্তি সই করে বাংলাদেশ। এই চুক্তি সইয়ের ১০ দিনের মধ্যে প্রকল্প অনুমোদন হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে হাবিবুল্লাহ মজুমদার বলেন, ঋণ সহায়তার বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তির আগেই প্রকল্প প্রস্তুতের জন্য সময় পাওয়া গিয়েছিল।
গত জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় বাংলাদেশকে একশ’ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দেয় ভারত।
এছাড়া একনেক সভায় ভারত থেকে বিদ্যুত্ আমদানির লক্ষ্যে ৩০ কিলোমিটার গ্রিড ইন্টারকানেকশন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য এক হাজার ৭৯ কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষ একটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে ৭শ’ কোটি টাকা দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং ৩৭৯ কোটি টাকার জোগান দেবে বাংলাদেশ সরকার। হাবিবুল্লাহ মজুমদার বলেন, এ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশের ভেড়ামারা থেকে ভারতের বহরমপুর সীমান্ত পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার ৪০০ কেভি গ্রিড সংযোগ লাইন নির্মাণ করা হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রথম বছরে ২৫০ মেগাওয়াট এবং পরের ৩৪ বছর ৫০০ মেগাওয়াট করে বিদ্যুত্ আদান-প্রদান করা যাবে। ২০১২ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পরই বিদ্যুত্ আদান-প্রদান করা যাবে বলে জানান তিনি।
এছাড়া দেশে গ্যাস সঙ্কট মেটাতে ৫টি নতুন কূপ খনন ও ১টি কূপ মেরামতের জন্য ৭৬৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে একনেকে।
অনুমোদন পাওয়া অন্য প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ৯১ কোটি টাকা ব্যয়ে বাজুরিয়া- গান্ধাসুর- সাতপাড়- পাতিয়ারা- রামদিয়া (রামদিয়াবাজার বাইপাসসহ) সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প, ২৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচুড়িয়া -ফরিদপুর - ভাঙ্গা রেলপথ পুনর্বাসন ও নির্মাণ প্রকল্প এবং ৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে গোয়ালন্দ- ফরিদপুর- তাড়াইল সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প।

http://www.amardeshonline.com/pages/details/2010/08/18/39744

No comments:

Post a Comment