Saturday, 24 September 2011

সীমান্ত হত্যাকাণ্ড নিয়ে অধিকারের কেসস্টাডি : কারণ ছাড়াই বিএসএফ গুলি করে মেরেছে সিলেটের আশরাফুলকে



স্টাফ রিপোর্টার

সীমান্তে ভারতীয় নিরাপত্তা রক্ষী (বিএসএফ) গুলি চালিয়ে নিরপরাধ বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ডের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে অধিকার’র অনুসন্ধানে। সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী কালিডর ধলাই নদী এলাকায় পাথরের কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে বিএসএফ’র গুলিতে প্রাণ হারায় আশরাফুল। আশরাফুলকে নির্দয়ভাবে হত্যা করার ঘটনাটি বেসরকারি সংস্থা অধিকার কেসস্টাডি হিসেবে গ্রহণ করে অনুসন্ধান চালায়।
অধিকারের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১ জুলাই রাত ৯টায় একই উপজেলার বাঘারপাড় গ্রামের মো. আবদুুল আহাদ ও লালবানুর ছেলে আশরাফুল ইসলাম (২০), একই গ্রামের মৃত কনু মিয়া ও হাওয়াতুন নেছার ছেলে সোনা মিয়া (১৯) এবং পারুয়া নোয়াগাঁও গ্রামের আফতাব আলী ও আমিরুন নেছার ছেলে এলাইছ মিয়া (২২) পাথর আনতে সীমান্ত এলাকায় ধলাই নদীর বাংলাদেশ অংশে কালিডর পাথর কোয়ারিতে যায়। ভারতের শিলং অঞ্চলের ভোলাগঞ্জ থানার কালিডর ক্যাম্পের ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে আশরাফুল ও এলাইছ গুলিবিদ্ধ হয়। আশরাফুল ও এলাইছের পরিবার গুলিবিদ্ধ দুজনকে হাসপাতালে নেয়ার পথে আশরাফুল মারা যায় এবং এলাইছ মিয়াকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে।
সেখানে ৮ দিন চিকিত্সার পর বাড়িতে আনা হয়।
আবদুুল আহাদ অধিকার-কে জানান, তার ছেলে আশরাফুল ইসলাম তাকে কৃষিকাজে সহযোগিতা করত। ঘটনার কয়েক দিন আগে পশ্চিম ইসলাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ‘বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় টুর্নামেন্ট’-এ চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় আশরাফুল খেলোয়াড়দের পুরস্কার দিতে চেয়েছিল। এ পরিপ্রেক্ষিতে আশরাফুল তার বন্ধু এলাইছ মিয়া ও সোনামিয়াকে নিয়ে নদী থেকে পাথর সংগ্রহ ও বিক্রি করে পুরস্কার কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। পরিকল্পনামতো ১ জুলাই আনুমানিক রাত ৮টায় আশরাফুল দু’বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হয়। রাত ৯টায় নৌকাযোগে ধলাই নদীর কালিডর পাথর কোয়ারিতে পৌঁছে। সেখানে আরও প্রায় এক-দেড়শ’ শ্রমিক পাথর তোলার জন্য গিয়েছিল। রাত আনুমানিক ৯টা ৫ মিনিটে সোনামিয়া আশরাফুলের বাবাকে মোবাইল ফোনে জানায়, তার ছেলে ও এলাইছ পাথর তোলার জন্য নদীতে গেলে ভারতের বিএসএফ সদস্যরা তাদের দিকে গুলি ছোড়ে। বিএসএফ’র ছোড়া গুলি বাংলাদেশের ২শ’ গজ ভেতরে থাকা আশরাফুল ও এলাইছের শরীরে বিদ্ধ হয়। সোনামিয়া মোবাইল ফোনে তাকে আরও জানায়, গুলিবিদ্ধ দুজনকে কোম্পানীগঞ্জ থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের অবস্থার অবনতি হওয়ায় রাত আনুমানিক ১০টায় সোনামিয়া কোম্পানীগঞ্জ থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে তাদের উন্নত চিকিত্সার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়।
রাত সাড়ে ১১টায় চিকিত্সক আশরাফুলকে মৃত ঘোষণা করেন। আবদুুল আহাদ আরও জানান, পরদিন, ২ জুলাই আশরাফুলের লাশের ময়নাতদন্ত শেষে বিকাল সাড়ে ৫টায় হাসপাতাল থেকে লাশ নিয়ে রওনা দিয়ে বাসায় পৌঁছে রাত সাড়ে ৯টায়। এর পর তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। তিনি আরও জানান, আশরাফুলের মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত ৩৩টি ছররা গুলি লেগেছিল বলে ময়নাতদন্তকারী ডাক্তারের কাছ থেকে জেনেছেন। তার অপর ছেলে নজরুল ইসলাম ২ জুলাই কোম্পানীগঞ্জ থানায় গিয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে।
এলাইছ মিয়া অধিকার-কে জানায়, ১ জুলাই সে তার বন্ধু আশরাফুল ও সোনামিয়াকে সঙ্গে নিয়ে পাথর তোলার জন্য নৌকায় করে সীমান্ত এলাকার কালিডরে যান। সেখানে তখন প্রায় এক-দেড়শ’ শ্রমিক পাথর তুলছিল। এ সময় রাতের অন্ধকারে ভারত সীমান্ত থেকে বিএসএফ সদস্যরা তাদের দিকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের কেউ পানিতেই বসে পড়ে আবার অনেকে ডাঙায় শুয়ে পড়ে। বিএসএফ সদস্যদের গুলি এসে তার এবং আশরাফুলের শরীরে লাগে। সে জানায়, সেগুলো ছররা গুলি হওয়ায় শরীরের বিভিন্ন স্থানে তা বিদ্ধ হয়। গুলি ছোড়া বন্ধ করে বিএসএফ সদস্যরা চলে গেলে উপস্থিত শ্রমিকদের সহায়তায় সোনামিয়া তাকে ও আশরাফুলকে চিকিত্সার জন্য কোম্পানীগঞ্জ থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিত্সার পর তাদের অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় দুজনকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে ডাক্তার আশরাফুলকে মৃত ঘোষণা করেন এবং সে নিজে ওই হাসপাতালের চতুর্থ তলার ৪নম্বর ওয়ার্ডে ৮দিন চিকিত্সা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। তার শরীরে ২৫-২৬টি ছররা গুলি লেগেছিল। সে শুনেছে, আশরাফুলের মাথায় ও বুকের নিচে গুলিবিদ্ধ হওয়ায় প্রচুর রক্তক্ষরণে সে মারা যায়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সোনামিয়া অধিকার-কে বলে, আশরাফুল ও এলাইছের সঙ্গে ১ জুলাই পাথর তোলার জন্য কালিডর এলাকায় যায়। তারা বাংলাদেশের ২শ’ গজ ভেতরে পাথর তোলার জন্য গেলে রাতের অন্ধকারে বিএসএফ সদস্যরা তাদের দিকে গুলি ছোড়ে। এতে আশরাফুল ও এলাইছ গুলিবিদ্ধ হয়। সে তখন মোবাইল ফোনে এলাইছ এবং আশরাফুলের বাড়িতে তাদের আহত হওয়ার খবর জানায়। সে ও শ্রমিকরা গুলিবিদ্ধ দুজনকে প্রথমে কোম্পানীগঞ্জ থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। কর্তব্যরত ডাক্তার প্রাথমিক চিকিত্সার পর তাদের অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে বলেন। তখন সে তাদের সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার আশরাফুলকে মৃত ঘোষণা করেন।
থানা স্বাস্থ্য কর্মকর্ত ডা. আবদুুল্লাহ অধিকার-কে বলেন, কয়েকজন লোক ১ জুলাই রাত ১০টায় কালিডর থেকে গুলিবিদ্ধ আশরাফুল ও এলাইছ মিয়া নামে দুজনকে নিয়ে থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসে। তিনি দুজনকে প্রাথমিক চিকিত্সা দেন। তবে তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তিনি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাদের নিতে বলেন।
কোম্পানীগঞ্জ থানা পুলিশ পরির্দশক কামাল আহমদ অধিকার-কে বলেন, ২ জুলাই রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে বাঘারপাড় গ্রামের নজরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি থানায় এসে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। মামলার এজাহারে নজরুল ইসলাম উল্লেখ করে, তার ছোট ভাই আশরাফুল ইসলাম ১ জুলাই বন্ধু এলাইছ মিয়া ও সোনামিয়াকে নিয়ে পাথর আনতে সীমান্ত এলাকার ধলাই নদীর বাংলাদেশ অংশে কালিডর পাথর কোয়ারিতে যায়। অজ্ঞাতনামা বিএসএফ সদস্যরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে তার ভাই আশরাফুল মারা যায়।
পুলিশ পরিদর্শক কামাল আহমদ এর পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের কিছু অংশ নদীতে ভেঙে গেছে। সেখানে বাংলাদেশের শ্রমিকরা পাথর তুলতে গেলে বিএসএফ সদস্যরা প্রায়ই বেআইনিভাবে গুলি ছোড়ে। এতে প্রায়ই মানুষ মারা যায়। এসব বিষয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরাও জানেন।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ’র সুবেদার চান মিয়া অধিকার-কে বলেন, ১ জুলাই এ ঘটনার কথা তিনি শুনেছেন। তবে এ ব্যাপারে তিনি কিছু বলতে অপারগ। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ সহকারী মাসুক আহমদ অধিকার-কে বলেন, ১ জুলাই রাত আনুমানিক ১১টা ৪৫মিনিটে কোম্পানীগঞ্জ থানার পুলিশ সদস্যরা আশরাফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে আনেন। ২ জুলাই দুপুরের দিকে লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। লাশের বিভিন্ন অংশে ছররা গুলি লেগেছিল। তাছাড়া লাশের শরীর থেকে বেশ কিছু গুলি বের করে পুলিশকে আলামত হিসেবে দিয়ে দেয়া হয়। আশরাফুলের লাশের গোসলদানকারী আবদুুল বারী অধিকার-কে বলেন, তিনি আজিজুল হক ও আতাউর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে আশরাফুলের লাশের গোসল দিয়েছেন। লাশের মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত অনেক ছররা গুলির চিহ্ন দেখেছেন বলে জানান। এছাড়া প্রচুর রক্তক্ষরণেরও চিহ্ন ছিল।
সীমান্ত হত্যাকাণ্ড নিয়ে অধিকার’র মন্তব্যে বলা হয়েছে, ভারতীয় বিএসএফ’র গুলিতে সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যার ঘটনা অবিরত ঘটেই চলেছে। গত ১২ মার্চ ভারতের নয়াদিল্লিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ও বিএসএফ’র মধ্যে ৫দিনের বৈঠকের শেষ দিনে বিএসএফ’র মহাপরিচালক রমন শ্রীবাস্তব জানান, বাংলাদেশ সীমান্তে ভারত আর প্রাণঘাতী অস্ত্র চালাবে না; তবুও সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার করে ভারত নিরস্ত্র বাংলাদেশীদের নির্বিচারে হত্যা করছে

No comments:

Post a Comment