Saturday, 9 July 2011

সীমান্তে বিএসএফ যেভাবে বাংলাদেশী হত্যা করছে

অলিউল্লাহ নোমান
নানা কৌশলে সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা করছে বিএসএফ। বন্দুকের গুলির পাশাপাশি পাথর নিক্ষেপ করে এবং পিটিয়েও বাংলাদেশী হত্যা করা হচ্ছে। সীমান্তে পাখির মতো মানুষ হত্যা করছে বিএসএফ। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন ও মানবাধিকারের কোনো তোয়াক্কা করছে না তারা। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের সীমান্তে এত মানুষ খুন হয় না। শুধু খুন নয় ভূমি দখলেও মরিয়া ভারত।চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সীমান্তে বিএসএফের হাতে ১৭ জন বাংলাদেশী নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এর বাইরে চলতি মাসের প্রথম ৬ দিনে আরও ২ জন বাংলাদেশীকে বিএসএফ হত্যা করেছে। ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত বিএসএফের নির্যাতনে গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ৪৯ জন বাংলাদেশী নাগরিক। অপহরণ করা হয়েছে ৫ জনকে। সর্বশেষ গত ২ জুলাই সিলেটের ভোলাগঞ্জ সীমান্তে এক যুবককে গুলি করে এবং ৩০ জুন লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্তে এক যুবককে পাথর ছুড়ে হত্যা করা হয়। ভারত বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা করবে না বলে বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও রক্ষা করছে না। গত ২৪ মার্চ জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২৬ মাসে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ১৩৬ জন বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১৭০ জন। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তথ্য অনুযায়ী ২০১১ সালেও বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে আগের বছরগুলোর মতোই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। মানুষ খুন হচ্ছে, পিটিয়ে মারা হচ্ছে এমনকি বিষাক্ত ইনজেকশনও দেয়া হচ্ছে বাংলাদেশীদের। গত ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তের ৯৪৭ আন্তর্জাতিক সীমানা পিলারের কাছ দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরার সময় ফেলানী খাতুন (১৫) নামে এক কিশোরীকে বিএসএফ গুলি করে হত্যা করে। পাঁচ ঘণ্টা তার লাশ সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলন্ত অবস্থায় রাখার পর ভারতে নিয়ে যায়। ত্রিশ ঘণ্টা পর বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের কাছে ফেলানীর লাশ হস্তান্তর করে বিএসএফ। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫ দিনব্যাপী বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে ১২ মার্চ অনুষ্ঠিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বিএসএফের মহাপরিচালক রমন শ্রীবাস্তব বলেন, ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে স্পর্শকাতর কিছু স্থানে প্রাণঘাতী নয়, এমন আগ্নেয়াস্ত্র দেয়া হবে। এটি পরীক্ষামূলক সিদ্ধান্ত। এতে সফল হলে দুই দেশের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্তে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে। বিএসএফ মহাপরিচালকের এই বক্তব্যের পর গত ১৮ এপ্রিল সাতক্ষীরা জেলার গাজীপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বসন্তপুর গ্রামের মনসুর আলীর ছেলে রেকাতুল ইসলাম (১৭) নিহত হয়। গত ৭ মে দিনাজপুর সদর উপজেলার খানপুর গ্রামের ফয়জুর রহমানের ছেলে হাফিজুর রহমানকে (৩০) সুন্দরা বিওপির প্রধান পিলার ৩১৬-এর সাব পিলার-৪ এর বিপরীতে বিএসএফ সদস্যরা গুলি করে হত্যা করে। এছাড়া বিএসএফ নির্যাতনের নতুন পদ্ধতি হিসেবে বাংলাদেশীদের শরীরে ইনজেকশনের মাধ্যমে পেট্রল ঢুকিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ১৬ জুন যশোর জেলার শার্শা উপজেলার ধান্যখোলা গ্রামের শাহীন, শরিফুল ইসলাম ও মুলফিক্কারকে বিএসএফ আটক করে হকিস্টিক ও লাঠি দিয়ে পিটিয়ে তাদের শরীরে ইনজেকশনের মাধ্যমে পেট্রল ঢুকিয়ে দেয়। এদিকে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৮৩৮ নম্বর মেইন পিলারের কাছে মিজানুর রহমান নামে ২৮ বছরের এক যুবককে ২৮ জুন পাথর ছুড়ে হত্যা করা হয়। ভারতের ১০৪ বিএসএফের বিএসবাড়ি ক্যাম্পের টহল সদস্যদের ছোড়া গুলিতে মিজানুর রহমান নিহত হয়। বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরেই তাকে পাথর ছোড়া হয়। সীমান্তে বিএসএফের এই আক্রমণের ভয়ে এখন কৃষকরা চাষাবাদ করতেও ভয় পায়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করলেও গুলি করে বা পিটিয়ে হত্যার বিধান পৃথিবীর কোনো দেশে নেই। সীমান্ত অতিক্রম করলে প্রত্যেক দেশেই পাসপোর্ট আইনে মামলা করার বিধান রয়েছে। কিন্তু ভারত এই বিধানের তোয়াক্কা করে না। বাংলাদেশী নাগরিককে সীমান্তের কাছাকাছি দেখলেই গুলি করছে। রাতে কোনো কোনো সীমান্তে কারফিউ জারি থাকে।

No comments:

Post a Comment