
মানবাধিকার সংস্থা অধিকার লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক হত্যার শিকার রফিকুলের ঘটনা সরেজমিন তদন্ত করে এ মন্তব্য করেছে। অধিকার সরেজমিন তদন্ত শেষে প্রতিবেদনে বলছে, বিএসএফ নিরস্ত্র বাংলাদেশী রফিকুলকে পাথর ছুড়েই হত্যা করেছে। প্রতিবেদনে অধিকার সীমান্তে মৃত্যুর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে সক্রিয় পদক্ষেপ নিয়ে ভারত সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করতে দাবি জানায়। নিহত রফিকুলের বাড়ি লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম থানার উফারমারা গ্রামে। তার স্ত্রীর নাম মোছাম্মত মিনি বেগম। রিয়াদ হোসেন (৮) ও রিফাত হোসেন (৬) নামে তার দুটি সন্তান রয়েছে। রফিকুল কৃষিকাজের পাশাপাশি বুড়িমারী জিরোপয়েন্টে লেবারের কাজ করতেন।
অধিকার সরেজমিনে গিয়ে নিহতের স্ত্রী মোছাম্মত মিনি বেগম (২৮), ভাই নজরুল ইসলাম (৪৫), চাচাতো ভাই আবেদার রহমান (৪৫), ৮নং বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের আনসার ভিডিপি কমান্ডার এনামুল হক, লাশের সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুতকারী ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পাটগ্রাম থানার এসআই ক্ষীরোদ চন্দ্র বর্মণ, ময়না তদন্তকারী লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. গৌতম কুমার বিশ্বাস, হাসপাতালের মর্গ-সহকারী মোহাম্মদ আলী, বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) ধবলসুতী বিওপি, পাটগ্রামের নায়েব সুবেদার মেজবাহ এবং রফিকুলের লাশের গোসলদানকারীর সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদনটি তৈরি করে।
বিএসএফ সদস্য কর্তৃক পাথর ছুড়ে রফিকুল ইসলামকে হত্যার বিষয়ে পাটগ্রামে সরেজমিনে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে অধিকার জানতে পারে, চলতি বছর ২৪ জুলাই ভোর ৫টায় ভারত থেকে গরু নিয়ে সানিয়াজান নদী পার হওয়ার সময়ে ওই নদীর ভারতীয় অংশে নির্মিত ব্রিজের ওপর থেকে বিএসএফ সদস্যরা তাকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়ে আঘাত করে। এতে তার মাথা ফেটে যায়। পরে ব্রিজের ওপর তুলে আঘাত করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে। বিএসএফের ছোড়া পাথরে দুটি গরুও মারা যায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের আত্মীয়-স্বজনের বরাত দিয়ে অধিকার জানিয়েছে, বিএসএফ শুধু তাকে মেরেই ক্ষান্ত হয়নি, তার লাশ গুম করার লক্ষ্যে নদীতে বাঁশ পুঁতে তাতে বেঁধে রাখে। পরে খবর পেয়ে নিহতের আত্মীয়-স্বজনরা ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে নিয়ে আসে। লাশের সুরতহাল রিপোর্ট ও ময়নাতদন্তে বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। এছাড়া পাথরের আঘাতে তার মাথা ফেটে মগজ বেরিয়ে গিয়েছিল।
রফিকুলের স্ত্রীর বক্তব্য : মোছাম্মত মিনি বেগম অধিকারকে জানান, তার স্বামী একজন ভূমিহীন কৃষক। দুই সন্তান নিয়ে তার অভাবের সংসার। রফিকুল কৃষিকাজের অবসরে সীমান্তের বুড়িমারীর জিরো পয়েন্টে লেবারের কাজ করতেন। চলতি বছর ২৩ জুলাই ৫টায় তার স্বামী বাজার করতে বুড়িমারীবাজারে যান। রফিকুল রাতে আর বাসায় না ফেরায় তিনি তার চাচাতো ভাশুর মো. আবেদার রহমানকে বিষয়টি জানান। আবেদার রহমান তাকে বলেন, রফিকুল গরু আনতে যেতে পারে। ২৪ জুলাই ভোরে তিনি মোবাইল ফোনে রফিকুলের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে আবারও আবেদার রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আবেদার রহমান তাকে জানান, ভোরের দিকে তিনি বুড়িমারী বাজারে গিয়ে গরু ব্যবসায়ীদের কাছে শুনেছেন, রাতে অনেকেই ভারত থেকে গরু নিয়ে ফিরলেও রফিকুল ফেরেনি। এছাড়া বাজারে অনেককেই বলাবলি করতে শোনেন, বিএসএফ সদস্যরা রাতে নদী পারাপারকারীদের পাথর ছুড়ে আঘাত করেছে। রফিকুলকেও পাথর ছোড়া হয়েছিল বলে বাজারের অনেকেই আলোচনা করছিলেন।
তারপর আবেদার রহমান রফিকুলের ভাই নজরুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্তের বামনদল গ্রামে সানিয়াজান নদীর তীরে যান এবং নদী থেকে রফিকুলের লাশ উদ্ধার করে সকাল সাড়ে ৯টায় বাড়ি আনেন। লাশ বাড়ি আনার পরে পাটগ্রাম থানার পুলিশ সদস্যরা লাশ নিয়ে যায়। লাশের ময়নাতদন্ত শেষে ২৫ জুলাই বিকাল সাড়ে ৪টায় লাশ বাসায় নিয়ে আসার পর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। লাশের কপালে একটি ক্ষত ছিল, মাথার মগজ বেরিয়ে গিয়েছিল, নাক, মুখ ও কান দিয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছিল।
এসআই, পাটগ্রাম থানা : এসআই ক্ষীরোদ চন্দ্র বর্মণ অধিকারকে বলেন, ২৪ জুলাই দুপুর সোয়া ২টায় উফরমারা গ্রামের নজরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি থানায় আসেন এবং বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন (নম্বর-২১, তারিখ-২৪.৭.২০১১; ধারা-৩০২/২০১/৩৪ দণ্ডবিধি)। তিনি নিজেই মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা। তিনি বিকাল ৩টায় রফিকুলের বাড়ি যান এবং লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। পরে পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য লাশ লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে পাঠায়। ২৫ জুলাই ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে রফিকুলের লাশ হস্তান্তর করা হয়।
ডা. গৌতম কুমার বিশ্বাস : লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. গৌতম কুমার বিশ্বাস অধিকারকে বলেন, ২৪ জুলাই সন্ধ্যা ৭টায় পাটগ্রাম থানার পুলিশ সদস্যরা রফিকুল নামে এক ব্যক্তির লাশ হাসপাতালে আনেন। তিনি জানতে পারেন, বিএসএফ সদস্যদের পাথরের আঘাতে রফিকুল মারা গেছেন। ২৫ জুলাই সকাল আনুমানিক ১০টায় ডা. মোতাছিব, ডা. মেহেদী মাসুম ও তাকে নিয়ে গঠিত তিন সদস্যের বোর্ড লাশের ময়নাতদন্ত করেন। তিনি জানান, পাথর বা শক্ত কিছু দিয়ে কপালে আঘাত করায় করোটির হার ফেটে গিয়েছিল, যার ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েই রফিকুলের মৃত্যু হয়েছে।

