মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী ফরেন পলিসি তাদের ২০১১ এর জুলাই-আগস্ট সংখ্যায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে নির্বিচারে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ হত্যা ও নির্যাতনের ওপরে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। স্কট কার্নি, জ্যাসন মিকলেইন ও ক্রিসটেইন হোলসারের সেই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ফেলানী হত্যাকান্ড থেকে শুরু করে তুলে ধরা হয়েছে গত এক দশকের সীমান্ত হত্যার লোমহর্ষক নানা কাহিনী।
ম্যাগাজিনের ঐ রিপোর্টে বলা হয়েছে সীমান্তে বেড়া নির্মাণকে ভারতীয়রা তাদের জন্য একটি সর্বরোগ হরণকারী প্রতিষেধক হিসেবে বিবেচনা করছে। তাদের বিবেচনায় এই বেড়া নির্মাণের ফলে মুসলিম জঙ্গিবাদ ও কাজের সন্ধানে বেআইনিভাবে ভারতে প্রবেশকারী বিদেশীদের আটকানো সহজ হবে। কিন্তু তার পরেও সীমান্তে যেভাবে হত্যাকান্ড চলছে তা বিশ্ব বিবেকের দরজায় আজ কড়া নাড়ছে।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে ভারতের এই নির্বিচার হত্যাকান্ড বন্ধ করতে ভারতের উচ্চ পর্যায়ে বার বার আবেদন নিবেদন জানানোর পরেও কিন্তু এই হত্যাকান্ড বন্ধ হচ্ছে না। তবে তারা অনেক সময়েই আমাদেরকে এই বলে ওয়াদা দিয়েছে ও আশ্বস্ত করেছে যে তারা আর কোন হত্যাকান্ড ঘটাবে না কিংবা সীমান্তে তারা কোন ভারী অস্ত্রও আর ব্যবহার করবে না। কিন্তু কখনোই তারা বাস্তবে তাদের সেই কথা কিন্তু রাখেনি।
উপরন্তু ভারতের কর্তা ব্যক্তিরা বাংলাদেশীদের বিভিন্নভাবে অপরাধী সাজিয়ে এই হত্যাকান্ড অব্যাহত রেখেছে। এদিকে ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম' এর প্রধান কর্মকর্তা কিরিটি রায় বলেছেন সাধারণত সীমান্তের লাইন ম্যানের সাথে অর্থ লেনদেন ছাড়া কেউই বেড়া পারাপারের জন্য ঝুঁকি নেন না। তারা বিএসএফকে ঘুষ দিয়ে অন্যমনস্ক করে অবৈধ অভিভাসীদের সীমান্ত পারাপারে সহায়তার এই কাজটি করে থাকে। ভারতের এই মানবাধিকার সংগঠনটি গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশের অধিকার ও হিউম্যান রাইটস এর সাথে যৌথ উদ্যোগে সীমান্ত হত্যাকান্ড ও সমসাময়িক বিষয়ে একটি জরিপ কাজ পরিচালনা করে তাদের গবেষণা প্রতিবেদনও প্রকাশ করে। ঐ প্রতিবেদনে মাসুম এর প্রধান কিরিটি বলেন, সীমান্তে ঘুষ প্রথার কারণেই সেখানে এই হত্যাকান্ড বেশি ঘটে। ঘুষ না দিয়ে যদি কেউ সীমান্ত পার হতে চেষ্টা করে তাহলে লাইনম্যানরা বিষয়টি অস্ত্রধারী বিএসএফকে জানিয়ে দেয় এবং গুলী চালাতে উৎসাহিত করে।
সীমান্তে এই হত্যাকান্ডকে বৈধতা দেয়ার জন্য ভারতীয়রা বরাবরই নানা যুক্তি তুলে ধরে আসছে। তারা অনেক সময় বলে বেড়ায় নেহায়েত আত্মরক্ষার জন্যই সীমান্তরক্ষীরা গুলী চালাতে বাধ্য হয়। নচেৎ তারা কখনো গুলী করে না। তবে ভারতীয় এই কর্তা ব্যক্তিদের বক্তব্য যে কতটা মিথ্যাচার আর সত্যের অপলাপ তার প্রমাণও পাওয়া যায় মাসুম অধিকার ও হিউম্যান রাটস'র পরিচালিত জরিপের ঐ গবেষণা প্রতিবেদনে। তিনটি সংস্থার যৌথভাবে পরিচালিত ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে গত এক দশকে সীমান্তে নিহত হয়েছে এমন একজনেরও পরিচয় পাওয়া যায়নি যিনি সীমান্ত পার হতে গিয়ে কোন অস্ত্র বহন করেছেন। প্রতিবেদনে এই তথ্যটিই এসেছে যে বড়জোর তার হাতে হয়তো একটি লাঠি বা কাস্তে ছিল। সংগঠন তিনটি সীমান্তে নিরীহ মানুষের ওপরে বিএসএফ'র বিরুদ্ধে নির্যাতন চালানোরও অভিযোগ উত্থাপন করেছেন।
Saturday, 9 July 2011
ফরেন পলিসি' ম্যাগাজিনের রিপোর্ট ভারত-দুর্গের জন্য বাংলাদেশ ঘিরে দিল্লীর বার্লিন প্রাচীর
শাহেদ মতিউর রহমান : বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত এখন ক্রমেই বিশ্বের অন্যতম রক্তঝরা একটি সীমান্তাঞ্চলে পরিণত হচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সীমান্তবিষয়ক জটিলতার সংবাদ শিরোনাম হলেও সাম্প্রতিক সময়ের বেশ কিছু ঘটনা প্রবাহ এবং বাংলাদেশ ও ভারতের এই সীমান্তের হত্যাকান্ড নিয়ে বেশ উদ্বেগেরও সৃষ্টি করেছে। সূত্রে প্রকাশ গত এক দশকে দু'দেশের এক হাজার ৭৯০ মাইল দীর্ঘ এই সীমান্ত ঘিরে প্রায় এক হাজার নিরপরাধ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। ভারত তার ২৫ সালা সীমান্ত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ১২০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজটিও প্রায় সম্পন্ন করেছে। আগামী বছরের মধেই এর পুরো কাজটি তারা শেষ করতে চাইছে। তবে এত বড় একটি সীমানা ঘিরে ভারতের বেড়া নির্মাণের পরেও সীমান্তের এই হত্যাকান্ডের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছে। অনেকে আজ প্রশ্ন তুলেছেন তাহলে কী ভারত-দুর্গের জন্য বাংলাদেশ ঘিরে দিল্লীর কোন বার্লিন প্রাচীর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে?
সীমান্তে বিএসএফ যেভাবে বাংলাদেশী হত্যা করছে
অলিউল্লাহ নোমান
নানা কৌশলে সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা করছে বিএসএফ। বন্দুকের গুলির পাশাপাশি পাথর নিক্ষেপ করে এবং পিটিয়েও বাংলাদেশী হত্যা করা হচ্ছে। সীমান্তে পাখির মতো মানুষ হত্যা করছে বিএসএফ। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন ও মানবাধিকারের কোনো তোয়াক্কা করছে না তারা। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের সীমান্তে এত মানুষ খুন হয় না। শুধু খুন নয় ভূমি দখলেও মরিয়া ভারত।চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সীমান্তে বিএসএফের হাতে ১৭ জন বাংলাদেশী নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এর বাইরে চলতি মাসের প্রথম ৬ দিনে আরও ২ জন বাংলাদেশীকে বিএসএফ হত্যা করেছে। ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত বিএসএফের নির্যাতনে গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ৪৯ জন বাংলাদেশী নাগরিক। অপহরণ করা হয়েছে ৫ জনকে। সর্বশেষ গত ২ জুলাই সিলেটের ভোলাগঞ্জ সীমান্তে এক যুবককে গুলি করে এবং ৩০ জুন লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্তে এক যুবককে পাথর ছুড়ে হত্যা করা হয়। ভারত বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা করবে না বলে বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও রক্ষা করছে না। গত ২৪ মার্চ জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২৬ মাসে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ১৩৬ জন বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১৭০ জন। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তথ্য অনুযায়ী ২০১১ সালেও বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে আগের বছরগুলোর মতোই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। মানুষ খুন হচ্ছে, পিটিয়ে মারা হচ্ছে এমনকি বিষাক্ত ইনজেকশনও দেয়া হচ্ছে বাংলাদেশীদের। গত ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তের ৯৪৭ আন্তর্জাতিক সীমানা পিলারের কাছ দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরার সময় ফেলানী খাতুন (১৫) নামে এক কিশোরীকে বিএসএফ গুলি করে হত্যা করে। পাঁচ ঘণ্টা তার লাশ সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলন্ত অবস্থায় রাখার পর ভারতে নিয়ে যায়। ত্রিশ ঘণ্টা পর বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের কাছে ফেলানীর লাশ হস্তান্তর করে বিএসএফ। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫ দিনব্যাপী বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে ১২ মার্চ অনুষ্ঠিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বিএসএফের মহাপরিচালক রমন শ্রীবাস্তব বলেন, ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে স্পর্শকাতর কিছু স্থানে প্রাণঘাতী নয়, এমন আগ্নেয়াস্ত্র দেয়া হবে। এটি পরীক্ষামূলক সিদ্ধান্ত। এতে সফল হলে দুই দেশের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্তে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে। বিএসএফ মহাপরিচালকের এই বক্তব্যের পর গত ১৮ এপ্রিল সাতক্ষীরা জেলার গাজীপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বসন্তপুর গ্রামের মনসুর আলীর ছেলে রেকাতুল ইসলাম (১৭) নিহত হয়। গত ৭ মে দিনাজপুর সদর উপজেলার খানপুর গ্রামের ফয়জুর রহমানের ছেলে হাফিজুর রহমানকে (৩০) সুন্দরা বিওপির প্রধান পিলার ৩১৬-এর সাব পিলার-৪ এর বিপরীতে বিএসএফ সদস্যরা গুলি করে হত্যা করে। এছাড়া বিএসএফ নির্যাতনের নতুন পদ্ধতি হিসেবে বাংলাদেশীদের শরীরে ইনজেকশনের মাধ্যমে পেট্রল ঢুকিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ১৬ জুন যশোর জেলার শার্শা উপজেলার ধান্যখোলা গ্রামের শাহীন, শরিফুল ইসলাম ও মুলফিক্কারকে বিএসএফ আটক করে হকিস্টিক ও লাঠি দিয়ে পিটিয়ে তাদের শরীরে ইনজেকশনের মাধ্যমে পেট্রল ঢুকিয়ে দেয়। এদিকে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৮৩৮ নম্বর মেইন পিলারের কাছে মিজানুর রহমান নামে ২৮ বছরের এক যুবককে ২৮ জুন পাথর ছুড়ে হত্যা করা হয়। ভারতের ১০৪ বিএসএফের বিএসবাড়ি ক্যাম্পের টহল সদস্যদের ছোড়া গুলিতে মিজানুর রহমান নিহত হয়। বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরেই তাকে পাথর ছোড়া হয়। সীমান্তে বিএসএফের এই আক্রমণের ভয়ে এখন কৃষকরা চাষাবাদ করতেও ভয় পায়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করলেও গুলি করে বা পিটিয়ে হত্যার বিধান পৃথিবীর কোনো দেশে নেই। সীমান্ত অতিক্রম করলে প্রত্যেক দেশেই পাসপোর্ট আইনে মামলা করার বিধান রয়েছে। কিন্তু ভারত এই বিধানের তোয়াক্কা করে না। বাংলাদেশী নাগরিককে সীমান্তের কাছাকাছি দেখলেই গুলি করছে। রাতে কোনো কোনো সীমান্তে কারফিউ জারি থাকে।
Wednesday, 29 June 2011
সিলেট সীমান্তে জনতার প্রতিরোধে এবার রক্ষা পেল ৫০ একর ভূমি : প্রতিবাদকারীদের বিএসএফের হুমকি, বিজিবিকে দেখা যায়নি

মো. দেলোয়ার হোসেন, জৈন্তাপুর (সিলেট)
সিলেট সীমান্তে জনতার প্রতিরোধের মুখে এবার রক্ষা পেল বাংলাদেশের ৫০ একর জমি। জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার পাদুয়া সীমান্তের সোনারহাট মনাইকান্দি, কুলুমছড়া এলাকায় ১২৬৪নং পিলারের ৪-এস থেকে ১২৬৬নং পিলারের ১-এস পর্যন্ত গতকাল প্রায় ৫০ একর ভূমি ভারতকে সমজিয়ে দেয়ার কথা ছিল। এরই লক্ষ্যে বাংলাদেশের পক্ষে সহকারী পরিচালক (জরিপ) দবির উদ্দিন, ভারতের পক্ষে সানক্লিনের নেতৃত্বে উভয় দেশের ১৫-২০ জন জরিপ প্রতিনিধি দল ১২৬৪নং পিলারের ৪-এস থেকে জরিপ কাজ শুরু করে। দুপুর ১২টায় কুলুমছড়া গ্রামের ৫ শতাধিক জনতা জরিপ কাজে বাধা দেন। জরিপ বিষয়ে জানতে চাইলে জরিপ টিম এলাকাবাসীকে বলে, এখানে কতটুকু ভূমি আছে এ বিষয়ে জরিপ কাজ হচ্ছে। স্থানীয় জনতা আগে থেকে জানতে পেরেছেন—জরিপ করে বাংলাদেশের প্রায় ৫০ একর ভূমি ভারতকে বুঝিয়ে দেয়া হবে। এরই প্রতিবাদে গ্রামবাসী জরিপ কাজে বাধা দেন। তখন বিএসএফ গ্রামবাসীকে তাড়া করতে থাকে। একপর্যায়ে বিএসএফ বাংলাদেশের ৫০ গজ ভেতরে প্রবেশ করলে জনতা আরও বেশি উত্তেজিত হন এবং বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে মিছিল করতে থাকেন। সীমান্তের ধারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে জীবনের বিনিময়ে ভূমি রক্ষা করার জন্য মানবপ্রাচীর গড়ে তোলেন সীমান্তবাসী। কিন্তু বাংলাদেশের সীমান্ত প্রহরী বিডিআরের নতুন নামধারী বডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি সদস্যদের তখন ওই এলাকায় দেখা যায়নি। এর আগে গত শনিবার (১৮ জুন) সিলেটেরই তামাবিল সীমান্তে একইভাবে গণপ্রতিরোধের মুখে বাংলাদেশের ভূখণ্ড যৌথ জরিপের নামে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়।গত ডিসেম্বর থেকে সীমান্তে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য সীমান্ত পিলার পরিদর্শন, অপদখলীয় ভূমি চিহ্নিতকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভারত-বাংলাদেশ জয়েন্ট বাউন্ডারি ওয়ার্কিং গ্রুপের যৌথ জরিপ কাজ শুরু হয়। ভারতীয় বিএসএফ ও নাগরিকরা বিভিন্ন সময়ে নানা অজুহাতে জরিপ কাজে বাধা দেয়। গত ৬ মাস ধরে একাধিক বৈঠকের পর জরিপ কাজ করতে দেয়নি ভারতীয় নাগরিকরা। গত ২ ও ৩ জুন ভারতীয় হাইকমিশনার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জয়েন্ট সেক্রেটারি পর্যায়ে বৈঠকের পর আবার জরিপ কাজ শুরু হয়। এই বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা আজও সীমান্তবাসী জানেন না। সীমান্তবাসী, বিজিবি ও প্রশাসনকে আড়াল করে উচ্চপর্যায়ের জরিপ টিম ভারতকে বাংলার ভূখণ্ড তুলে দিতে এই জরিপ কাজ করছে বলে সীমান্তবাসী জানান। কুলুমছড়া এলাকার আজিজুর রহমান, জলিল মিয়া, আবদুল কাদির, মুখলেছ মিয়াসহ শতাধিক গ্রামবাসী এই প্রতিবেদককে জানান, ব্রিটিশ আমল থেকে আমরা এই এলাকায় বসবাস করে আসছি। ফসলাদি ফলানো আমাদের প্রধান কাজ। কিন্তু গত দু’বছর ধরে ভারতীয় বিএসএফের বাধার ফলে আমরা কৃষিকাজ করতে পারছি না। তারা আরও জানান, ১৯৫২ সালে ও ২০০২ সালে সীমান্তের জরিপ কাজ হয়। সীমান্তের এই ভূমিগুলো এলাকার বিভিন্ন ব্যক্তি ও সরকারের নামে রেকর্ডভুক্ত আছে। এলাকাবাসী আরও জানান, ভারতীয় নাগরিক ও বিএসএফ বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকা মসজিদ, মাদরাসা, কবরস্থান, কৃষিজমি ও ফসলাদি দখল করে নিতে চায়। ভারতীয় এই আগ্রাসী তত্পরতা সীমান্তবাসী জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করবেন। এলাকাবাসীর বাধার মুখে জরিপ না করে উভয় দেশের জরিপ দল ফিরে চলে যায়। এ বিষয়ে জরিপ টিমের সঙ্গে আলাপকালে তারা কোনো কথা বলতে রাজি নয় বলে জানান। তারা বলেন, উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
জয়পুরহাটে আরও একজন নিহত : বিএসএফের উপর্যুপরি খুন
পাঁচবিবি (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি
জয়পুরহাটের পাঁচবিবির নন্দাইল সীমান্তে গতকাল ভোরে বিএসএফের গুলিতে ফজলু মিয়া (৩৯) নামে আরও এক গরু ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। নিহত ফজলু জেলার পাঁচবিবি উপজেলার নন্দাইল গ্রামের কফিল উদ্দিনের ছেলে। মাত্র একদিন আগে বেনাপোলের ধান্যখোলা সীমান্তে আবদুুল আলিম (৩৫) নামে আরেক বাংলাদেশী গরু ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করে বিএসএফ।জয়পুরহাট-৩ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধীন হাটখোলা সীমান্ত ফাঁড়ির নায়েব সুবেদার জাহাঙ্গীর আলম ও এলাকাবাসী জানায়, ভোর ৪টার দিকে ভারত সীমান্তের ২৭৯-এর ১৮ সাব-পিলার এলাকার কাঁটাতারের বেড়ার বাইরে দিয়ে ভারতীয় গরু ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের গরু দিতে আসে। বাংলাদেশী গরু ব্যবসায়ীরাও সেখানে যায়। এ সময় ভারতের সিঁধাই ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা ২ রাউন্ড গুলি ছুড়ে। তাদের গুলি ফজলু মিয়ার (৩৯) গলায় বিদ্ধ হলে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। পরে বিএসএফ লাশটি ভেতরে নিয়ে যায়। বিজেবির হাটখোলা সীমান্ত ফাঁড়ি লাশ ফেরত চেয়ে ও এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বিএসএফের সিঁধাই ক্যাম্পে একটি পত্র পাঠানো হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
Tuesday, 31 May 2011
ফারাক্কার মারাত্মক প্রভাব : ৫৩ নৌরুট বন্ধের উপক্রম

ইলিয়াস খান
ফারাক্কার ভয়াবহ প্রভাব এবার দেশের নদ-নদীর ওপর পড়তে শুরু করেছে। একের পর এক নদী শুকিয়ে যাওয়ায় চলাচলের মূল মাধ্যম নৌরুটগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিটিএ) এ পর্যন্ত দেশের ৫৩টি নৌরুটকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দ্রুত এসব নৌরুটে ড্রেজিং কাজ শুরু করা না হলে নৌ-যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব রুট সচল রাখতে এরই মধ্যে ১১ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে একনেকে। এ বিষয় নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবদুল মান্নান হাওলাদার বলেন, প্রাথমিকভাবে ৫৩টি নৌরুট চিহ্নিত করা হয়েছে। এজন্য ১১ হাজার কোটি টাকার একটি প্রস্তাবনা তৈরি করে আমরা একনেকে পাঠিয়েছি। প্রকল্পটি পাস হলে নৌরুটগুলোকে সাবেক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতিসহ প্রকল্পটির আওতায় ৩টি ড্রেজার ২০১১ সালের এপ্রিল-মের মধ্যে পাওয়া যাবে। এছাড়া অন্যান্য সহায়ক জলযান ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহের কাজ আগামী জুনের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করছি।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বিআইডব্লিউটিএ’র সংরক্ষণ, খনন কর্মসূচির আওতায় নৌ-চলাচলে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ ফেরি ও নৌরুটগুলোর নাব্য অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নৌপথগুলোর নাব্য উন্নয়ন কল্পে ৫৩টি নৌপথে ৯ বছর মেয়াদি ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনার আওতায় আড়িয়াল খাঁ ও কুমার নদীভুক্ত মাদারীপুর-চরমুগুরিয়া-টেকেরহাট-গোপালগঞ্জ নৌপথের নাব্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে মাদারীপুর-চরমুগুরিয়া-টেকেরহাট-গোপালগঞ্জ-নৌপথে ড্রেজিং শীর্ষক একটি প্রকল্প ২৫ জানুয়ারি একনেক অনুমোদন দিয়েছে এবং বাস্তবায়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া ১ম পর্যায়ে ২৪টি নৌপথে ক্যাপিটাল ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অভ্যন্তরীণ নৌপথের ৫৩টি রুটে ক্যাপিটাল ড্রেজিং (১ম পর্যায় ২৪ নৌপথ) শীর্ষক একটি প্রকল্প ১২টি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ড্রেজিং শীর্ষক অপর একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। সূত্র জানায়, ৫৩টি রুটে ক্যাপিটাল ড্রেজিং (১ম পর্যায় ২৪ নৌপথ) প্রকল্পের ডিপিপির ওপর পরিকল্পনা কমিশনে ২০১০ সালের ২২ আগস্ট পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ড্রেজিং দরপত্র পুনর্নির্ধারণ পূর্বক ডিপিপি পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠন শেষে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে ২৭ জানুয়ারি প্রকল্পের ওপর এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিপিপি পুনর্গঠন করে ৩ মার্চ নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় যা অনুমোদন প্রক্রিয়াধীনের নিমিত্তে ৩ এপ্রিল পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে যে ২৪টি রুট ড্রেজিংয়ের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে— ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ-গজারিয়া-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম-রুট, চাঁদপুর-হিজলা-বরিশাল রুট, গাশিয়াখালী-বরিশাল- কালিগঞ্জ-চাঁদপুর-আরিচা নৌরুট, ভৈরব বাজার-লিপসা-চটক-সিলেট নৌরুট, গাজলাজর-মোহনগঞ্জ রুট, লোয়ারগা- দুলোভপুর রুট, চিটরি-নবীনগর-কুটিবাজার নৌরুট, নরসিংদী-কাটিয়াদী নৌরুট, নরসিংদী-মরিচাকান্দি-সেলিমগঞ্জ-বাঞ্জারামপুর-হোমনা নৌরুট, দাউদকান্দি- হোমনা-রামকৃষ্ণপুর রুট, চাঁদপুর-ইচুলি-ফরিদগঞ্জ রুট, বরিশাল-ঝালকাঠি-পাথরঘাটা নৌরুট, খুলনা-গাজিরহাট- মানিকদা রুট, নন্দীবাজার-মাদারীপুর নৌরুট, দিলালপুর-গৌরাদিঘার-চামড়াঘাট-নীলকিয়াটপাড়া-নেত্রকোনা রুট, মনুমুখ-মৌলভীবাজার নৌরুট, মিরপুর-সাভার নৌরুট, শ্রীপুর-ভোলা খেয়াঘাট-গঙ্গাপুর-ভোলা নৌরুট, চৌকিঘাটা- কালীগঞ্জ রুট, পটুয়াখালী-মীর্জাগঞ্জ রুট, হোসনাবাদ-টরকী-ফাঁসিতলা নৌরুট এবং দালারচর-বালিয়াকান্দি-বোয়ালমারী- কাশিয়ানি নৌরুট। অপর যে ১২টি নৌপথ ড্রেজিংয়ের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে সেগুলো হলো— ঢাকা-তালতলা-ডহুরী, জারিরা-মাদারীপুর-কবিরাজপুর-চৌধুরীর হাট-পিজাখালি-চরজানাজাত-কেওড়াকান্দি নৌরুট, লাহার হাট-ভেদুরিয়া নৌরুট, শাহেবের হাট-টুঙ্গিবাড়ী-লাহার হাট রুট, ঢাকা সদর ঘাট-ভিরুলিয়া-পাটুরিয়া-বাগাবাড়ী রুট, ডেমরা-ঘোড়াশাল-পলাশ রুট, ঢাকা-রামচর-মাদারীপুর নৌরুট, ঢাকা-শরিয়তপুর নৌরুট, চাঁদপুর-নন্দীরবাজার-শিকারপুর- হুলারহাট রুট, হুলারহাট-চরচাপালি-গোপালগঞ্জ রুট, নারায়ণগঞ্জ-দাউদকান্দি রুট এবং ঢাকা-সুরেশ্বর- আঙ্গারিয়া-মাদারীপুর-নৌরুট। এ বিষয়ে লঞ্চ মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সুন্দরবন নেভিগেশনের স্বত্বাধিকারী সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, আশ্বাসের বাণী বহু শুনেছি এখন চাই বাস্তবায়ন। ৩টি নতুন ড্রেজার আনা হবে এমনটা শুনতে শুনতে কান ব্যথা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু বাস্তবায়ন দেখতে পাচ্ছি না। দক্ষিণাঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষ এখনও নৌপথে যাতায়াতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অল্প খরচে তারা ঢাকা-বরিশাল রুটে যাতায়াত করেন। কিন্তু দেশের বেশিরভাগ বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের নৌরুটগুলো বন্ধ হয়ে যেতে বসেছে। বরিশালে গত ৩০ বছরে ২৭টি নৌরুট বন্ধ হয়ে গেছে। সরকার অনতিবিলম্বে ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা না করলে সব নৌরুট যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, দেশে যে ড্রেজারগুলো আছে তার বেশিরভাগ যেখানে প্রয়োজন নেই সেখানে ফেলে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ কার্গো মালিক সমিতি অ্যাসোসিয়েশনের বরিশাল বিভাগীয় সম্পাদক মো. ইউনুচ বলেন, ভাষানচর- গাশিয়াখালি-সন্ন্যাসী-চরমোনাইসহ বিভিন্ন রুটে প্রায়ই আটকা পড়ে জাহাজগুলো। পর্যাপ্ত ড্রেজিং ব্যবস্থা না থাকায় চর পরে ভরে যাচ্ছে বেশিরভাগ নৌরুট। সরকার এখনই ব্যবস্থা না নিলে অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হবে লঞ্চ ও কার্গো মালিকরা
বিএসএফের গুলিতে সাতক্ষীরা সীমান্তে বাংলাদেশী নিহত

শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে রহমত আলী (৩৫) নামের বাংলাদেশী এক রাখাল নিহত হয়েছে। ২৯ এপ্রিল রাত ১২টার দিকে সাতক্ষীরা সীমান্তের ঘোনা জিরো পয়েন্ট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত রাখাল রহমত আলী সাতক্ষীরা জেলা সদরের বাঁশদহা গ্রামের ইউনুছ আলীর ছেলে।
এদিকে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশী রাখাল নিহত হওয়ার প্রতিবাদে ঘোনা সীমান্তের জিরো পয়েন্টে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক হয়েছে।
সীমান্ত গ্রামবাসী জানান, রহমত আলীসহ কয়েকজন রাখাল গরু আনতে শুক্রবার সন্ধ্যায় ঘোনা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যান। রাত ১২টার দিকে গরু নিয়ে ফেরার সময় ঘোনা সীমান্তের ৭নং মেইন পিলারের দেড়শ’ গজ অভ্যন্তরে ভারতের জয়নগর ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এ সময় রহমত আলী ঘাড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যায়। স্থানীয় লোকজন তার লাশ উদ্ধার করে ঘোনা বিজিবি ক্যাম্পে খবর দেন ।
ঘোনা বিজিবি ক্যাম্পের নায়েব সুবেদার মতিউর রহমান জানান, বিএসএফের গুলিতে রহমত আলীর নিহত হওয়ার প্রতিবাদে বিজিবির পক্ষ থেকে গতকাল সকালে বিএসএফের জয়নগর ক্যাম্পে প্রতিবাদপত্র পাঠানো হয়। সে অনুযায়ী ঘোনা সীমান্তের ৭নং মেইন পিলারের জিরো পয়েন্টে গতকাল সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক হয়। পতাকা বৈঠকে রাখালরা গরু পাচারের সময় বিএসএফ বাধা দিলে তাদের ওপর হামলা চালানোর অভিযোগ করা হয়। নিরূপায় হয়ে গুলি চালাতে হয়েছে বলে বিএসএফের পক্ষ থেকে বলা হয়। তবে রহমত আলীর মৃত্যুতে বিএসএফের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করে আগামীতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সব ধরনের চেষ্টা চালানো হবে বলে জানানো হয়। এছাড়া পতাকা বৈঠকে গরু পাচার নিয়েও কথা হয়।
বিজিবি ও বিএসএফের পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট দলের পক্ষে নেতৃত্বে দেন ভোমরা ক্যাম্পের সুবেদার মুনসুর হেলাল ও ভারতের জয়নগর ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার সউলকাসহান দত্ত।
সাতক্ষীরা সদর থানার উপ-পরিদর্শক হারান চন্দ্র পাল জানান, লাশ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে
Tuesday, 26 April 2011
সীমান্তে শিশুসহ দুজনকে হত্যা করল বিএসএফ

সামিউল মনির শ্যামনগর (সাতক্ষীরা)
সাতক্ষীরার গাজীপুর সীমান্তে এবার এক শিশুসহ দুই বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে বিএসএফ। নিহত রাখাল শিশু রেকাতুল ইসলামের লাশ পাওয়া গেলেও অপর একটি লাশ নিয়ে গেছে বিএসএফ সদস্যরা। বিএসএফের নির্বিচার গুলিতে আহত হয়েছেন আরও অনেকে। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ দুজনকে গুরুতর অবস্থায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বহুবার সীমান্তে হত্যা বন্ধ রাখার আশ্বাস দিয়েছে ভারত। কিন্তু সে আশ্বাস কোনোই কাজে আসছে না। বিএসএফের গুলিতে কুড়িগ্রাম সীমান্তে কিশোরী ফেলানীর নির্মম মৃত্যুর পর ভারত সরকার কথা দিয়েছিল তারা আর সীমান্তে গুলি চালিয়ে কাউকে হত্যা করবে না। সীমান্তহত্যা শূন্যের কোটায় আনারও আশ্বাস দেয়া হয়। এমনকি প্রয়োজনে রাবার বুলেট ব্যবহারেরও ঘোষণা দেয়া হয়; কিন্তু কথা রাখেনি বিএসএফ।
বাংলাদেশের সাতক্ষীরা সীমান্ত সংলগ্ন কলাপোতা এলাকায় গতকাল নিহত বাংলাদেশী শিশু রেকাতুল ইসলাম (১৫) সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার বসন্তপুর গ্রামের মুনছুর গাজীর ছেলে। সে পেশায় দিনমজুর। অপর নিহতের পরিচয় জানা যায়নি। কারণ নির্বিচারে গুলির পর যে যেদিকে পেরেছে পালিয়ে গেছে। তবে একটি মৃতদেহ বিএসএফ সদস্যরা উদ্ধার করে বশিরহাট থানায় নিয়ে গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। আহত যে দুজনকে পাওয়া গেছে, তারা হলেন কালিগঞ্জ উপজেলার মাঘুরালি গ্রামের পোটাল মিঞার ছেলে শাহাদাত হোসেন (২৪) ও শ্যামনগর উপজেলার জাবাখালী গ্রামের ইমান আলী মোল্লার ছেলে আজিজুল ইসলাম (৪২)।
জানা যায়, শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী গ্রামের মোমিন গাজীর ছেলে রফিকুল ইসলাম সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী লক্ষ্মীদাঁড়ি গ্রামের সাবুরালীর বাড়িতে অবস্থান করে ভারত থেকে বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীদের গরু আনতে সহায়তা করে থাকে। রফিকুল রোববার সন্ধ্যায় গাজীপুর সীমান্ত দিয়ে রেকাতুল ইসলাম, শাহাদাত হোসেন, আজিজুল ইসলাম ও তারাসহ ২৮ জনকে ভারতে গরু আনতে পাঠায়। গরু নিয়ে ফেরার সময় গতকাল ভোর সাড়ে চারটার দিকে গাজীপুর সীমান্তের ৫ নং মেইন পিলারের ৬ নং সাবপিলারের বিপরীতে জিরো পয়েন্ট থেকে ভারতের ২০০ গজ ভেতরে কলাপোতা গ্রামে হেলাতলা ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা তাদের লক্ষ্য করে কমপক্ষে আট রাউন্ড গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই রেকাতুলসহ দু’জনের মৃত্যু হয়। রেকাতুলকে জিরো পয়েন্টে ফেলে গেলেও বিএসএফ অপর নিহত গরুর রাখালকে বশিরহাট থানায় নিয়ে যায়। শাহাদাত হোসেন ও আজিজুল ইসলাম গুলিবিদ্ধ হয়ে জিরো পয়েন্টে পৌঁছলে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তাদের খুলনার ২৫০ শয্যা হাসপাতালের উদ্দেশে পাঠানো হয়। নিহত রেকাতুলের লাশ জিরো পয়েন্ট থেকে এনে তার বাবা মুনছুর গাজীর কাছে তুলে দেয়া হয়।
কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সৈয়দ ফরিদউদ্দিন সাতক্ষীরা সদর উপজেলা সীমান্তের ভোমরা এলাকার বিপরীতে বিএসএফের গুলিতে রেকাতুল ইসলাম নিহত ও শাহাদাত হোসেনের জখম হওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, নিহত রেকাতুলের লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। আহত শাহাদাতকে খুলনা ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে ভোমরা বিজিবি ক্যাম্পের নায়েব সুবেদার আবদুল আজিজ তার এলাকার বিপরীতে ভারতে এ ধরনের কোনো রাখাল গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত বা আহত হওয়ার কথা অস্বীকার করেন।
এদিকে আমাদের সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সৈয়দ ফরিদউদ্দিন তাকে আরও জানিয়েছেন, সাতক্ষীরার ভোমরা সীমান্ত দিয়ে রেকাতুল গাজীসহ কয়েকজন যুবক সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে গরু আনতে যায়। গতকাল ভোরে গরু নিয়ে ফেরার পথে ভারতের বেলেডাঙ্গা সীমান্তে বিএসএফের গুলির মুখে পড়ে তারা। এ সময় বিএসএফ বাংলাদেশীদের লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। গুলিবিদ্ধ যুবকদের মধ্যে আহত রেকাতুল গাজীকে বাড়িতে আনার পথে সে মারা যায়। সাতক্ষীরা ৪১ বর্ডার গার্ডের অধিনায়ক লে. কর্নেল এনায়েত করিম জানান, বিএসএফের গুলিতে এক বাংলাদেশী যুবক নিহতের কথা শুনেছেন।
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন জাতীয় সংসদে বলেছিলেন, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে গত ২৭ মাসে ১৩৬ বাংলাদেশী নিহত হয়েছে। তিনি জানান, ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে গত মার্চ পর্যন্ত বিএসএফের গুলিতে ১৩৬ (২০০৯-এ ৬৭ জন, ২০১০-এ ৬০ জন ও চলতি বছরের ১৪ মার্চ পর্যন্ত ৯ জন) বাংলাদেশী নিহত ও ১৭০ জন আহত হন। সাহারা খাতুন বলেন, মার্চে সীমান্ত সম্মেলনে বিএসএফ ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্তে পরীক্ষামূলকভাবে রাবার বুলেটের মতো নন-লেথাল উইপন (প্রাণঘাতী নয়—এমন অস্ত্র) ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ভারত সরকার এরই মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে বিএসএফ সদস্যদের মধ্যে রাবার বুলেট সরবরাহও করেছে। বর্তমান সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ায় সীমান্তে বিএসএফের হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা কমে এসেছে দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে উভয় দেশ কাজ করছে।
Subscribe to:
Posts (Atom)