Friday, 7 January 2011

অধিকারের বার্ষিক প্রতিবেদন : ২০১০-এ প্রতি তিন দিনে ১ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার

বিশেষ প্রতিনিধি

গেল বছরটিতে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে প্রতি ৩ দিনে গড়ে একজন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। গুম হয়েছেন ১৬ জন—আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধরে নিয়ে যাওয়ার পর যাদের খোঁজ কেউ পায়নি। ৪ জন সাংবাদিন নিহত এবং আহত হয়েছেন আরও ১১৮ জন। ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৯১ জন নারী ও শিশু। গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে ১৭৪ ব্যক্তি। মানবাধিকার সংস্থা অধিকার দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে এক বছরের প্রতিবেদনে এ তথ্যগুলো উল্লেখ করেছে।
অধিকারের তথ্য অনুসারে ২০১০ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ছিল নাজুক। ২০০৯-এ ইউনিভার্সাল পিরিওডিক রিভিউ (ইউপিআর)-এর শুনানিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ দেখানোর কথা বলেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধে সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তা অব্যাহতভাবে চলেছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মধ্যে অন্তর্কলহ, চাঁদাবাজি, টেন্ডার দখল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাস ও অবৈধ হল দখলের মতো ঘটনাগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নির্যাতন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, রাজনৈতিক সহিংসতা, সভা-সমাবেশ বন্ধে ১৪৪ ধারা জারি, গুম, গার্মেন্টস শ্রমিকদের নির্যাতন ও গ্রেফতার, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে ২০১০ সালে।
অধিকারের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বাংলাদেশের ভূমি দখলসহ বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা, নির্যাতন, অপহরণ চালিয়ে যাচ্ছে। দুটি দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সীমান্ত সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ গত কয়েক দশক ধরে চরম সংযম প্রদর্শন করে এই সমস্যা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছে। কিন্তু ভারত সরকার বা তাদের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর দিক থেকে কোনো আশাপ্রদ মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়নি। প্রতিনিয়ত সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফ বাহিনীর হাতে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা, নির্যাতন ও অপহরণের শিকার হয়েছেন। এছাড়াও ভারতের উওর-পূর্বাঞ্চলীয় বিভিন্ন রাজ্যের ‘আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার’ আদায়ের সংগ্রামে নিয়োজিত নেতাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকে গ্রেফতারের পর ভারতীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নিজেদের জীবন রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে ‘আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার’ আদায়ের সংগ্রামে নিয়োজিত এই ভিন্নমতাবলম্বী নেতারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ (১) এর গ অনুচ্ছেদে বলা আছে, “...রাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ বা বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করিবেন।”
অধিকার-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১০ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে ক্রসফায়ারে র্যাব এবং নির্যাতনের ক্ষেত্রে পুলিশ ছিল প্রধান অভিযুক্ত। সন্ত্রাস দমন আইন-২০০৯ ও বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন আইন-২০০৬-এর মাধ্যমে বিরোধীদের দমন এবং গোপনীয়তার অধিকারসহ অন্যান্য মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন করা হয়েছে। আদালত অবমাননা আইন ১৯২৬ এবং সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতা’র সঙ্গে বিরোধপূর্ণ অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন আইনি সংশোধনীর মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানসমূহকে অকার্যকর, অগ্রহণযোগ্য ও নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়াস ছিল বছরজুড়ে।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধে সরকার বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা ২০১০ সাল জুড়েই অব্যাহত ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইন ভঙ্গ করে সন্দেহভাজন ব্যক্তি, বিপ্লবী বামপন্থী এবং নিরীহ ব্যক্তিদেরকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করেছে। ২০১০ সালে ১২৭ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ডগুলো সংঘটিত হয়েছে র্যাব ও পুলিশ অথবা র্যাব-পুলিশের যৌথ কর্তৃক। অধিকার-এর তথ্যানুযায়ী ২০১০ সালে প্রতি ৩ দিনে গড়ে ১ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। অধিকার-এর সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ১২৭ জনের মধ্যে তথাকথিত ‘ক্রসফায়ার’-এ ১০১ জন, নির্যাতনে ২২ জন এবং গুলিতে ২ জন এবং ২ জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এঁদের মধ্যে র্যাবের হাতে ৬৮ জন, পুলিশের হাতে ৪৩ জন, র্যাব-পুলিশের যৌথ অভিযানে ৯ জন, র্যাব-কোসগার্ডের যৌথ অভিযানে ৩ জন, র্যাব-পুলিশ-কোসগার্ডের যৌথ অভিযানে ৩ এবং বিডিআর-এর হাতে ১ জন নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নির্যাতন
২০১০ সালে ৬৭ জন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক নির্যাতিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এঁদের মধ্যে ১১ জন র্যাবের হাতে এবং ৫৬ জন পুলিশের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৬৭ জনের মধ্যে ২২ জন নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
জেল ও বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে মৃত্যু
২০১০ সালে ১১০ জন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে মারা গেছেন। এঁদের মধ্যে ৬ জন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে থাকাকালীন ক্রসফায়ারে, ২২ জন নির্যাতনে এবং ১ জন গুলিতে মারা গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া এই সময়ে ৬০ জন ব্যক্তি জেল হেফাজতে ‘অসুস্থতাজনিত’ কারণে মারা গেছেন। এ সময়ে ২ জন ব্যক্তি কোর্ট হেফাজতে, ২ জন থানায় এবং ১ জন র্যাব হেফাজতে মারা গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিডিআর বিদ্রোহের অভিযোগে আটক ১৫ জন বিডিআর সদস্য জেল ও অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে মারা গেছেন।
গুম
২০১০ সালে ১৬ জন ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গুম হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ভিকটিমের পরিবারগুলোর অভিযোগ উল্লিখিত ব্যক্তিকে সাদা পোশাকধারী আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা র্যাব ও পুলিশের পরিচয় দিয়ে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।
রাজনৈতিক সহিংসতা
২০১০ সাল জুড়েই প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতার মাত্রা ছিল ব্যাপক। প্রধান দল দুটি একে অপরকে দোষারোপ করতে ব্যস্ত থেকেছে। অধিকার-এর তথ্য অনুযায়ী ২০১০ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় ২২০ জন নিহত এবং ১৩ হাজার ৯৯৯ জন আহত হন। এ সময়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ৫৭৬টি এবং বিএনপির ৯২টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে ৩৮ জন নিহত এবং ৫ হাজার ৬১৪ জন আহত হন। অন্যদিকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘাতে ৭ জন নিহত ও ১ হাজার ১৪৬ জন আহত হন। এ সময়ে সভা-সমাবেশ বন্ধ করতে প্রশাসন বিভিন্ন এলাকায় ১১৪ বার ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করে।
নির্বাচনী সহিংসতা
অধিকার-এর তথ্যানুযায়ী ভোলা-৩ আসনের উপনির্বাচনে নির্বাচনী সহিংসতায় ২১৮ জন আহত হন। এদের মধ্যে প্রাকনির্বাচনী সহিংসতায় ১০৯, নির্বাচনের দিন ৪৬ এবং নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় ৬৩ জন আহত হন বলে জানা গেছে।
হরতাল
২০১০ সালের জুন ও নভেম্বর মাসে বিএনপি তিনটি হরতাল আহ্বান করে। হরতাল চলাকালে বিএনপির সমর্থকদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। এতে সারা দেশে হরতাল সমর্থকসহ ৩৫৫ জন আহত হন এবং পুলিশ ১৬৭ পিকেটারকে আটক করে। এছাড়া হরতালের আগের দিন হরতাল সমর্থনকারীরা যানবাহন ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।
সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা
২০১০ সালে সাংবাদিকরা বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন। এ সময়ে ৪ সাংবাদিক নিহত, ১১৮ সাংবাদিক আহত, ৪৩ জন লাঞ্ছিত ও ৪৯ জন হুমকির সম্মুখীন হন। এ সময় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে ১৭ সাংবাদিকের ওপর হামলা, ২ জনকে গ্রেফতার, ১ জন অপহৃত ও ১৩ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
তৈরি পোশাক শিল্প শ্রমিকদের অবস্থা
২০১০ সাল জুড়ে ছিল তৈরি পোশাক শিল্প কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা। শ্রমিকদের বকেয়া বেতন এবং ন্যূনতম মজুরি ৫ হাজার টাকার দাবিতে শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষে ৭ শ্রমিক নিহত এবং ২ হাজার ৫৩৮ শ্রমিক আহত হন। এসব ঘটনায় শ্রমিক নেতা মন্টু ঘোষ, মোশরেফা মিশু, বাহারানে সুলতান বাহারসহ ২৫৯ শ্রমিককে গ্রেফতার করা হয় এবং তাদের রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিএসএফের মানবাধিকার লঙ্ঘন
২০১০ সালে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অব্যাহত ছিল। ওই বছর ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ৭৪ বাংলাদেশীকে হত্যা করে। এদের মধ্যে ২৪ জনকে নির্যাতন এবং ৫০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সময়ে ৭২ জন বিএসএফের হাতে আহত হয়েছেন। বিএসএফের হাতে আহত ৭২ জনের মধ্যে ৩২ জন নির্যাতিত ও ৪০ জন গুলিবিদ্ধ হন। একই সময়ে ৪৩ বাংলাদেশী বিএসএফের হাতে অপহৃত হয়েছেন।
নারীর প্রতি সহিংসতা
২০১০ সালে নারীর প্রতি সহিংসতা অব্যাহত ছিল। এ সময় বহু নারী ধর্ষণ, যৌতুক, এসিড সন্ত্রাস এবং যৌন হয়রানির শিকার হন। মূলত নারীর প্রতি সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, আইন ও বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, ভিকটিম ও সাক্ষীর নিরাপত্তার অভাব, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্নীতি, নারীর অর্থনৈতিক দুরবস্থা, দুর্বল প্রশাসন ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে নারী নির্যাতিত হন। ভিকটিম নারী বিচার না পাওয়ায় অপরাধীরা উত্সাহিত হয়েছে এবং গাণিতিকহারে সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে।
২০১০ সালে মোট ৫৫৬ নারী ও মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হন বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে ২৪৮ নারী এবং ৩০৮ মেয়েশিশু। ওই ২৪৮ নারীর মধ্যে ৬১ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় এবং ১১৯ জন গণধর্ষণের শিকার হন। এছাড়া ২ নারী ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেন। ৩০৮ মেয়েশিশুর মধ্যে ৩০ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় এবং ৯৩ জন গণধর্ষণের শিকার হয়। এছাড়া ৪ মেয়েশিশু ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করে।
যৌতুক সহিংসতা : ২০১০ সালে ৩৮৭ নারী ও শিশু যৌতুক সহিংসতার শিকার হন। এদের মধ্যে ২৪৩ জনকে যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয় এবং ১২২ জন বিভিন্নভাবে অমানবিক আচরণের শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময়ে ২২ নারী যৌতুকের কারণে নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন।
যৌন হয়রানি : ২০১০ সালে ৩২৬ নারী যৌন হয়রানির শিকার হন। এদের মধ্যে ৭ জন বখাটেদের হাতে নিহত, ১২৯ জন লাঞ্ছিত বা আহত, ২৫ জন আত্মহত্যা, ৫ জন অপহৃত হন। এ ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে ১৪ পুরুষ যৌন হয়রানিকারী বখাটেদের হাতে আক্রান্ত হয়ে নিহত এবং ১২৭ জন আহত হন।
এসিড সহিংসতা
২০১০ সালে ১৩৭ জন এসিড সহিংসতার শিকার হন; এদের মধ্যে ৮৪ নারী, ৩২ পুরুষ এবং ২১ শিশু। এছাড়া ২১ শিশুর মধ্যে ১৬ মেয়েশিশু এবং ৫ ছেলেশিশু এসিডদগ্ধ হয়।
ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মানবাধিকার লঙ্ঘন
২০১০ সালে ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ২ জন নিহত এবং ২৪৪ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ২৩টি মন্দির ভাংচুর হয়েছে। অপরদিকে জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর হামলার ঘটনায় ৬ জন নিহত এবং ১৪০ জন আহত হন।

Friday, 31 December 2010

সীমান্তে বিজিবি সদস্যরা নীরব ভূমিকায় : ভারতীয় লোকজন বাংলাদেশে ঢুকে মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে



হাতীবান্ধা (লালমনিরহাট) প্রতিনিধি

ভারতীয় লোকজন বাংলাদেশ সীমান্তে ঢুকে খর্প নদী থেকে মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। তা দেখেও বিজিবি (বিডিআর) কোনো প্রতিবাদ করছে না। অথচ বাংলাদেশী লোকজন সীমান্তবর্তী ওই নদীতে মাছ ধরতে গেলে ভারতীয় বিএসএফ মারমুখী হয়ে বাধা দিচ্ছে। মাছ ধরতে গিয়ে গত ৭ দিনে বিএসএফের গুলিতে ২ বাংলাদেশী নিহত হয়েছে।
লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার দোলাপাড়া, সিঙ্গিমারী, বড়াইপাড়া, গেন্দুকুড়ি, দইখাওয়া, আমঝোলসহ গোটা জেলার সীমান্তে খর্প নদীর অবস্থান। ওই নদীর পশ্চিম ও দক্ষিণ তীর বাংলাদেশী ভূখণ্ড এবং পূর্ব ও উত্তর তীর ভারতীয় ভূখণ্ড। বাংলাদেশী লোকজন সীমান্তে মাছ ধরতে গেলে বিএসএফ বাধা দেয় এবং অস্ত্র উঁচিয়ে তেড়ে আসে। অপরদিকে ভারতীয় লোকজন বিজিবির সামনেই বাংলাদেশী ভূখণ্ডে ঢুকে মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এতে বিজিবি বাধা দিচ্ছে না—এমন অভিযোগ সীমান্তবাসীর। সীমান্তবর্তী লোকজন অভিযোগ করেন, আমরা আমাদের জমিতে মাছ ধরতে বা ঘাস কাটতে গেলে বিএসএফের পাশাপাশি ভারতীয় লোকজনও বাধা দেয়। বিএসএফ অস্ত্র উঁচু করে গুলির হুমকি দিলে আমরা ভয়ে পালিয়ে আসি। অথচ ভারতীয় লোকজন বাংলাদেশী বিওপি ক্যাম্পের কাছে এসে মাছ ধরে ও ঘাস কেটে নিয়ে গেলেও কিছুই করে না। বিষয়গুলো বিজিবিকে জানানো হলেও কোনো কাজ হয়নি। গত শুক্রবার সকালে গোতামারী গ্রামের গোলাম মোহাম্মদের ছেলে সাইফুল ইসলাম দইখাওয়া সীমান্তে মাছ ধরতে গেলে ভারতীয় বড় মরিচা ক্যাম্পের বিএসএফ বাংলাদেশে ঢুকে তাকে গুলি করে হত্যা করে। এর দু’দিন পর বুড়িমারী সীমান্ত এলাকা থেকে বিএসএফ আলতাব হোসেনের ছেলে বেলাল হোসেন নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করে। এ ব্যাপারে লালমনিরহাট বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আসলাম জানান, বিএসএফ গত ৭ দিনে ২ বাংলাদেশীকে গুলি করে হত্যা করে। ভারতীয় লোকজন বাংলাদেশে প্রবেশের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমরা কোনো ছাড় দিতে রাজি নই

কংগ্রেস প্রকাশিত বইয়ের তথ্য : বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পেছনে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোই দায়ী

সফিকুল ইসলাম, কলকাতা

কংগ্রেসের ১২৫তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত পুস্তিকা ‘কংগ্রেস অ্যান্ড দ্য মেকিং অফ দ্য ইন্ডিয়ান নেশনস’-এ বাবরি মসজিদ ধ্বংস ও সেই সময়কার কার্যকলাপের জন্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ, বিজেপি ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদকেই দায়ী করা হয়েছে, তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিংহ রাওয়ের ভূমিকাকে লঘু করে দেখানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির সম্পাদনা করা বইয়ে লেখা হয়েছে ১৯৮০ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রচারে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার ডাক এবং সেস্থানে রামমন্দির করার আহ্বান জানানো হয়। এরপর বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানীর রাম রথযাত্রায় দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ায়। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ডাকে এক সমাবেশে উত্তর প্রদেশের তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং প্রথম উত্তেজক ভাষণ দেন। এরপর এলকে আদভানী, উমা ভারতী, মুরলী মনোহর যোশীর মতো বিজেপি নেতাদের বক্তব্য রাখার মধ্য দিয়ে এমন উত্তেজনা ছড়ায় যে, ‘করসেবক’ নামধারী উগ্র হিন্দুরা শাবল, গাইতি ইত্যাদি নিয়ে মসজিদের মিনারসহ অন্যান্য স্থানে উঠে পড়ে এবং মসজিদকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। বইয়ে লেখা হয়েছে, সুপ্রিমকোর্ট বলেছিল, মসজিদ সুরক্ষার দায়িত্ব রাজ্য সরকারের। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং সে দায়িত্ব পালনের কথা দিলেও তিনি তা পালন করেননি। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধে এবং প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও ১৯৯২ সালের ৭ ডিসেম্বর দেশের সব সাম্প্রদায়িক সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন বলে পুস্তিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। পুস্তিকাটিতে রাজীব গান্ধীর প্রশংসা করা হলেও তার ভাই সঞ্জয় গান্ধীর নিন্দা করা হয়েছে। দেশে জরুরি অবস্থার মূল্যায়ন করতে গিয়ে স্বীকার করা হয়েছে, ওই সময়ে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব হয়েছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যকলাপ তো বটেই বিচার ব্যবস্থাও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও খর্ব করা হয়েছিল। তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্ধিরা গান্ধী সীমাহীন ক্ষমতা ভোগ করেছিলেন বললেও সমালোচনার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিলেন তার পুত্র সঞ্জয় গান্ধীই। পরিবার পরিকল্পনা থেকে বস্তি উচ্ছেদ তার স্বৈরাচারী মনোভাবের কথাই খোলাখুলি স্বীকার করেছে কংগ্রেস। আত্মসমীক্ষার ওই বইয়ে বোঝানো হয়েছে ক্ষমতার উত্স ছিলেন সঞ্জয়ই। কংগ্রেসের এই মূল্যায়নে মোটেই সন্তুষ্ট নয় বিজেপি। তাদের বক্তব্য, নিজেদের ভুল অন্যের ঘাড়ে চাপাচ্ছেন প্রণব মুখার্জিরা।
প্রসঙ্গত, প্রয়াত সঞ্জয় গান্ধীর স্ত্রী মানেকা গান্ধী ও পুত্র বরুণ এখন বিজেপির সংসদ সদস্য। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে সঞ্জয়কে এবং বাবরি মসজিদ ইস্যুতে নেতাদের ভূমিকা কি আড়াল করতে চাইছে বিজেপি। দলের মুখপাত্র শাহনওয়াজ হুসেন কংগ্রেসের বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন।

টিপাইমুখ বাঁধের বিরুদ্ধে আসামে বিক্ষোভ



শফিকুল ইসলাম, কলকাতা

মনিপুরের টিপাইমুখ বরাক নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বুধবার আসামের শিলচরে বিশাল মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। নরসিংহটোলা মাঠে সমাবেশের পর বের হয় মিছিল। প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে লেখা এক স্মারকলিপি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বিসি নাথের কাছে পেশ করা হয়। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে স্মারকপত্র পাঠানো হয়েছে কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় শক্তিমন্ত্রী এবং আসাম ও মনিপুরের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। সমাবেশ ও মিছিল কার্যসূচির আয়োজক কমিটি আন পিপলস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (কোপ) এবং সোসাইটি অব অ্যাকটিভিস্টস ফর ফরেস্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (সেফ)। এই ইস্যুতে একাত্মতা প্রকাশ করে কর্মসূচিতে অংশ নেয় বরাক ভ্যালি ডেমোক্রেটিক স্টুডেন্টস অব ইয়ুথ অর্গানাইজেশন, বরাক ভ্যালি স্টুডেন্টস ফ্রন্ট অল আসাম ট্রাইবাল সংঘ, অল বরাক স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন প্রভৃতি সংগঠনের কর্মকর্তারাও। অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই ছিলেন মনিপুরী মহিলা।
কোপ সংস্থার সাধারণ সম্পাদক পীযূষ কান্তি দাস এবং সেফ সংস্থার সাধারণ সম্পাদক জিষ্ণু দত্ত সাংবাদিকদের বলেন, রবাক নদীর ওপর টিপাইমুখে ১৮০ মিটার উঁচু বাঁধ নির্মিত হলে তা বৃহত্তর অঞ্চলের পরিবেশে বিরাট প্রভাব ফেলবে। প্রস্তাবিত বাঁধকে তারা ওয়াটার বোম্ব বলে অভিহিত করে।
তারা বলেন, উজানে বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে এতে ভাটি অঞ্চলের কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, সরকার তা একবারও ভেবে দেখেনি। অথচ প্রস্তাবিত বাঁধ বরাক উপত্যকার অর্থনীতিতে বিরাট প্রভাব ফেলবে। জীববৈচিত্র্য চরম বিঘ্নিত হবে। তারা পানি সঙ্কট, শস্য ক্ষেতের ওপর বিরূপ প্রভাব, নৌচালনার সমস্যা, নদী দূষণ ইত্যাদি আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন

Wednesday, 29 December 2010

সিলেট সীমান্তে আড়াইশ’ কি.মি. কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ ভারতের : করিমগঞ্জে ১৪৪ ধারা : নতুন বছরের শুরুতে সীমান্ত জরিপ

এটিএম হায়দার সিলেট

বৃহত্তর সিলেট সীমান্তে প্রায় আড়াইশ’ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ শেষ করেছে ভারত। আরও ১২২ কিলোমিটার বেড়া নির্মাণ চলছে। এমনকি কাঁটাতার থাকাবস্থায়ও করিমগঞ্জ সীমান্তে রাতকালীন ১৪৪ ধারা জারি রেখেছে স্থানীয় জেলা প্রশাসন। চোরাকারবার রোধ ও বাংলাদেশ থেকে কথিত অনুপ্রবেশ রোধে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে ভারতীয় পত্রিকায় বলা হয়েছে। এদিকে স্থগিত হয়ে যাওয়া ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত জরিপ নতুন বছরে শুরু হচ্ছে। রোববার বিকালে সিলেটের জেলা প্রশাসক পদুয়া সীমান্ত ঘুরে গেছেন।
জানা যায়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কেবল আসাম ও মেঘালয়ে ৫৭০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে ২৫০ কিলোমিটারে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ শেষ করেছে ভারত। এছাড়া ১২২ কিলোমিটারের বেড়া নির্মাণের কাজ বর্তমানে চলছে। সীমান্তের ১৩০ কিলোমিটারে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়নি, যার বেশিরভাগ মেঘালয়ের জৈন্তা হিলস ডিস্ট্রিক এলাকায়। বর্তমানে এ এলাকা সীমান্তে ভূমির জরিপ কাজের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিএসএফের আসাম-মেঘালয় ফ্রন্টের ইন্সপেক্টর জেনারেল আরসি সাক্সেনা সম্প্রতি শিলংয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্থানীয় সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফ এক বছরে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার ভারতীয় রুপির গরু, গাঁজা, কাঠসহ আটক করেছে। এছাড়া তিনি ভারতের বিভিন্ন সংগঠনের ৪২ উগ্রপন্থীকে আটক, ২ অস্ত্র ব্যবসায়ী, ৫০ লাখ রুপির ব্রাউন সুগার আটকের তথ্য দেন। এদিকে সিলেটের জকিগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার
উপজেলার বিপরীতে আসামের করিমগঞ্জ জেলায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ১৪৪ জারি করেছে প্রশাসন। ভারতীয় পত্রিকার খবরে প্রকাশ, বাংলাদেশ থেকে ভারতে উগ্রপন্থীদের প্রবেশ, চোরাকারবার রোধসহ অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এক আদেশ জারি করে ভারত-বাংলা সীমান্তে রাত ৯টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত ১০০ মিটার এলাকায় চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। করিমগঞ্জের ভাঙ্গা থেকে সরিষা পর্যন্ত এলাকা জাতীয় সড়কের পার্শ্ববর্তী সীমান্ত সংলগ্ন ২০০ মিটার এলাকা এবং কারখানা পুতনী থেকে লাফাশাইল পর্যন্ত সীমান্ত সংলগ্ন ৫০০ মিটার এলাকায় চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ভারতের নিয়ন্ত্রণাধীন কুশিয়ারা নদী ও তার তীরের ক্ষেত্রে একই আদেশ বলবত্ থাকবে। এছাড়া রাত ৯টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত লক্ষ্মীবাজার, টিলাবাজার, চুরাইবাড়ি, কুকিতল, চাঁদখিরা, আদমটিলা, মোকামটিলা, বিলবাড়ি, ফকিরবাজার থেকে লাতু-মহিশাসন পূর্ত বিভাগের সড়কেও যান চলাচল করতে পারবে না। কোনো ব্যক্তি রাত ৯টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত কুশিয়ারা নদীতে দেশি নৌকা নিয়ে চলাচল করতে পারবে না। এমনকি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ৫০০ মিটার এলাকায় গবাদিপশু নিয়ে চলাচল করতে পারবে না। কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় চাল, চিনি, মদ, কাপড়, সুপারি, তেল, বাঁশ, কাঠ নিয়ে চলাচল করতে পারবে না। তবে করিমগঞ্জ শহর এলাকায় এ আদেশ বলবত্ থাকবে না। অনুপ্রবেশ ও চোরাকারবার রোধে জেলা প্রশাসন এ আদেশ জারি করেছে।
অপরদিকে সিলেট সীমান্তে ভারত-বাংলাদেশ সীমানা জরিপ নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহে শুরু হতে পারে। ভারতে মেঘালয় রাজ্যের বিপরীত সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পদুয়া এবং জৈন্তাপুর উপজেলার ডিবিবিল ও কেন্দ্রীয় হাওরে বিরোধপূর্ণ ভূমির জরিপ বিভিন্ন কারণে স্থগিত রয়েছে। সিলেটের জেলা প্রশাসক আবু সৈয়দ মোহাম্মদ হাশিম রোববার বিকালে গোয়াইনঘাটের পদুয়া সীমান্ত পরিদর্শন করেন। তিনি সেখানে বিরোধপূর্ণ ভূমি নিয়ে বিজিবি কর্মকর্তা এবং স্থানীয় গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলেন।
উল্লেখ্য, সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের প্রতাপপুরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে অবস্থিত ঘটনাবহুল পদুয়া গ্রামের ২৩০ একর ভূখণ্ড ভারত জোরপূর্বক নিজেদের দখলে রেখেছে। আন্তর্জাতিক সীমানা পিলার বিরাজমান অবস্থায় ভারত কর্তৃক জোরপূর্বক বেদখলে রাখা এই জমি গত ২৯ বছর ধরে বাংলাদেশের হাতছাড়া রয়েছে। সীমান্ত জরিপে পদুয়া ছাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে এ আশঙ্কা থেকে জরিপ চলাকালীন গত ১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ভারতীয় নাগরিক ও বিএসএফ সীমান্তে হাঙ্গামা সৃষ্টি করে। চলতি মাসের ৭ তারিখ দুই দেশের ভূমি সার্ভে কমিশনের যৌথ বৈঠকের সিদ্ধান্তের আলোকে সীমান্তের ভূমি জরিপ শুরু হয়। আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে মেঘালয়-সিলেট সীমান্তের জরিপ শেষ হওয়ার কথা।

বুড়িমারী সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশী নিহত

লালমনিরহাট ও পাটগ্রাম প্রতিনিধি

হাতিবান্ধার দইখাওয়া সীমান্তে শুক্রবার বাংলাদেশী যুবক হত্যার তিনদিনের ব্যবধানে গতকাল ভোর সাড়ে ৫টায় লালমনিরহাটের বুড়িমারী সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে বেলাল হোসেন (২৫) নামের আরও এক বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন। এ সময় বাবু নামের আরও এক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন। তাকে পাটগ্রাম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। নিহত বেলাল হোসেনের লাশ বিএসএফ সদস্যরা টেনেহিঁচড়ে ভারতের অভ্যন্তরে নিয়ে গেছে। তিনি পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী বামনদল গ্রামের আফসার আলীর ছেলে। এদিকে বাংলাদেশী যুবককে গুলি করে হত্যা ও লাশ টেনেহিঁচড়ে ভারতের অভ্যন্তরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় সীমান্তে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। গুলি করে যুবক হত্যা ও অন্য একজনকে গুলি করে আহত করার ঘটনায় কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ (বিজিবি)। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নিহত যুবকের লাশ ফেরত না দেয়ায় ওই সীমান্তে বিজিডি-বিএসএফ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। এ ছাড়া বিনা উস্কানিতে বিএসএফের হাতে একের পর এক বাংলাদেশী হত্যার ঘটনায় সীমান্তবাসীরা বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিচ্ছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
বিজিবি সূত্র জানায়, গতকাল ভোর সাড়ে ৫টায় পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী সীমান্তের ৮৩৮ নম্বর মেইন পিলার সংলগ্ন এলাকায় ভারতের ১০৪ বিএসবাড়ি ব্যাটালিয়নের বিএসএফ সদস্যরা বাংলাদেশ অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ করে বাংলাদেশী যুবক বেলালকে লক্ষ্য করে পরপর ৭ রাউন্ড গুলি চালায়। এতে বেলাল নিহত এবং বাবু নামের অন্য একজন আহত হন। একপর্যায়ে বিএসএফ সদস্যরা তার লাশ টেনেহিঁচড়ে ভারতের অভ্যন্তরে নিয়ে যায়।
এ ব্যাপারে লালমনিরহাট বিজিবির উপ-অধিনায়ক মেজর শফিক জানান, বিএসএফের গুলিতে নিহত বেলাল ও আহত বাবু গরু আনতে ভারতে যাওয়ার সময় বিএসএফ তাদের লক্ষ্য করে পরপর ৭ রাউন্ড গুলি চালায়। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণের কারণে বেলাল হোসেন ঘটনাস্থলেই মারা যান। বিএসএফ সদস্যরা আন্তর্জাতিক সীমানা আইন লঙ্ঘন করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ করে তার লাশ টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়। লাশ ফেরত চেয়ে গতকাল সকাল ১০টায় বিশেষ দূত মাধ্যমে ১০৪ বিএসবাড়ি বিএসএফ ব্যাটালিয়ন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়া হয়েছে। তবে বিএসএফের পক্ষ থেকে লাশ ফেরতের ব্যাপারে কোনো সাড়া মেলেনি।

আসামে টিপাইমুখ বাঁধের বিরুদ্ধে আন্দোলন কর্মসূচি

শফিকুল ইসলাম, কলকাতা

টিপাইমুখ বাঁধের বিরোধিতা করে আসামের শিলচরে আগামী মঙ্গলবার এক বিশাল মিছিল করার কর্মসূচি নিয়েছে কমিটি অন পিপলস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট সংক্ষেপে কোপ। প্রস্তাবিত এই বৃহত্ নদীবাঁধ বিরোধী মিছিলে এ অঞ্চলের প্রতিটি দল, সংগঠনসহ ব্যক্তি বিশেষকেও অংশ নিতে কোপ এক বিবৃতিতে আবেদন জানিয়েছে। তাদের দাবি, টিপাইমুখ নদী বাঁধের বিরুদ্ধে এই মিছিল-সমাবেশ সম্পর্কে জনসাধারণের কাছ থেকে এরই মধ্যে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে।
টিপাইমুখে প্রস্তাবিত এই বাঁধের বিপদ সম্পর্কে বলতে গিয়ে কোপ তাদের বিবৃতিতে বলেছে, ‘প্রস্তাবিত বাঁধের বহুবিধ ক্ষতির কথা ভেবে একদিকে বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ, সমাজকর্মীরা যেমন প্রতিবাদে সরব হয়েছেন, তেমনি এই অঞ্চলের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশেল জনতা, সংস্থা, সংগঠনও প্রতিবাদ-আন্দোলন করছে। এই বাঁধসহ বৃহত্ নদীবাঁধের বিরুদ্ধে এই ভূখণ্ডসহ অন্য এলাকায়ও আন্দোলনের সমুদ্রকল্লোল ক্রমে তীব্রতর হচ্ছে। মানবসভ্যতার পক্ষে সর্বনাশী বৃহত্ নদীবাঁধের বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশের আন্দোলন আর চিন্তা-ভাবনা থেকে আমরা নিজেদের বিছিন্ন রাখতে পারি না। আমরাও তাদের চিন্তার সহযাত্রী ও আন্দোলনের অংশীদার।’
কমিটি অন পিপলস অ্যান্ড এনভায়রন-মেন্ট আরও বলেছে, টিপাইমুখের জলবোমাতুল্য বিশাল এই ৫০০ মিটার দৈর্ঘ্য আর ১৮১ মিটার উচ্চতার প্রস্তাবিত বরাক বাঁধ ভাটি বরাকের শিয়রে আক্ষরিক অর্থেই সর্বক্ষণের সমন। অতি স্পর্শকাতর ভূমিকম্প অঞ্চল পাঁচের অন্তর্ভুক্ত এলাকায় মাটি ভরাট পদ্ধতির এই প্রায় ষাটতলা উঁচু বাঁধ কোনো কারণে ভেঙে গেলে বরাক-সুরমার অস্তিত্ব চিল-কাকেরাও খুঁজে পাবে না। সুরমা-বরাকের ইতািস-ঐতিহ্য সব বিলীন হয়ে যাবে। ধুয়েমুছে বিশাল এই জনপদ এক কবরস্থান বা শ্মশানভূমিতে পরিণত হবে। বাঁধের উজান এলাকায় আবহামনকাল ধরে বসবাস করে আসা মার-মনিপুরী-নাগা-কুকি ইত্যাদি জনগোষ্ঠীর মানুষদের ছিন্নমূল হতে হবে। ইন্দো-বার্মা, ইন্দো-মালয় আর ইন্দো-চীন জীববৈচিত্র্য মানচিত্রের এই অঞ্চলে বিদ্যমান বিরল আর বিলুপ্তপ্রায় বহু জীববৈচিত্র্য বিলীন হয়ে যাবে। হারিয়ে যাবে শত শত গাছ-গাছড়া আর জানা-অজানা পাখি-প্রাণীর কলকাকলি। বর্ষা বৃষ্টিতে বন্যার তোড় বাড়বে আবার শীতে থাকবে না পানি। মূল নদীর বুক শুকিয়ে যাওয়ার জন্য পার্শ্ববর্তী সমতল এলাকার ছোট-বড় সব নদী-নালা, খাল-বিল-পুকুর-ডোবায় পানি থাকবে না। পানির মাত্রা কমে যাওয়ায় বরাক নদী থেকে বহু প্রজাতির মাছ নিশ্চিহ্ন হবে।
টিপাইমুখ বাঁধ বিরোধী সংস্থার দাবি, এই অবস্থায় সবচেয়ে বেশি যাদের বিপন্ন হতে হবে, সেই বরাক উপত্যকার আমজনতা কোনোভাবেই চুপ থাকবে না। সংগঠিত হয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করে টিপাইমুখ বাঁধ বন্ধ করবেই তারা।