Tuesday, 26 February 2013

পুলিশের নির্বিচারে আলেম হত্যা : স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল, সিংগাইরে গুলিতে মহিলাসহ নিহত ৫ আজ মানিকগঞ্জে হরতাল, সারাদেশে বিক্ষোভ ও নফল রোজা ইসলামীদলগুলোর ডাকা হরতালে মানিকগঞ্জে পুলিশের গুলিতে আলেম ও মহিলাসহ ৫ জন নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী। নিহতরা খেলাফত মজলিস, ছাত্রমজলিস ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মী। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আজ মানিকগঞ্জ জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল এবং সারাদেশে বিক্ষোভ ও নফল রোজা রাখা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইসলামী দলগুলো। বিএনপি এ হরতালে সমর্থন জানিয়েছে। হরতাল চলাকালে বগুড়ায় পিকেটার দেখামাত্রই গুলি চালায় পুলিশ। সেখানে ২০ জন আহত হয়। এছাড়া রাজধানীসহ সারাদেশে সাঁজোয়া যান নিয়ে মারমুখী অবস্থানে ছিল সশস্ত্র র্যাব ও পুলিশ। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় টহল দেয় বিজিবি। ইসলামী দলগুলোর অফিস, বিভিন্ন মাদরাসা ও মসজিদ সকাল থেকেই ঘেরাও করে রাখে পুলিশ। গুরুত্বপূর্ণ সব জায়গায় মোতায়েন করা হয় বিপুল সংখ্যক র্যাব ও পুলিশ। ফুটপাতের দোকান খুলতে দেয়নি তারা। পাঞ্জাবি-টুপি পরা লোক দেখলেই ধাওয়া করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ কড়া অবস্থানের কারণে সারাদেশে তেমন কোনো পিকেটিং ও মিছিল করতে পারেনি হরতাল সমর্থকরা। তবে কিছু জায়গায় ঝটিকা মিছিল করে তারা। এ সময় বিক্ষিপ্তভাবে কিছু জায়গায় পুলিশের সঙ্গে পিকেটারদের সংঘর্ষ, ককটেল বিস্ফোরণ, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। হরতালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় সকালে একটি লেগুনায় আগুন ও ধানমন্ডিতে গাড়ি ভাংচুর করে পিকেটাররা। হরতালের সমর্থনে কামরাঙ্গীরচর মাদরাসায় ইসলামী দলগুলোর মিছিলে বাধা দেয় পুলিশ। সেখানে নাস্তিক ব্লগারদের কুশপুত্তলিকা পোড়ায় বিক্ষুব্ধরা কর্মীরা। এছাড়া রাজধানীর পল্টন, ফকিরাপুল ও মহাখালী এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ হয়। মতিঝিল ও বিজয়নগরসহ বিভিন্ন জায়গায় ফাঁকা গুলি চালায় পুলিশ। অপরদিকে হরতাল প্রতিরোধে লাঠি হাতে মিছিল-স্লোগানে সরব ছিল সরকারদলীয় ও শাহবাগের আন্দোলনকারীরা। এ সময় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামে ট্রেন অবরোধ করে রাখে মুসল্লিরা। এ সময় পিকেটারদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। চাঁদপুরেও দু’পক্ষে সংঘর্ষ হয়। এদিকে হরতালবিরোধী মিছিল থেকে হরিণাকুণ্ড, ঈশ্বরদীসহ বিভিন্ন স্থানে জামায়াত-শিবিরের অফিসে হামলা ও ভাংচুর করা হয়। ইসলামী ব্যাংকের পল্টন, কেরানীগঞ্জ, ভুলতা, রূপগঞ্জ, নওয়াপাড়াসহ বিভিন্ন শাখায়ও হামলা ও ভাংচুর চালানো হয়। এদিকে পিকেটিং ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্ত হরতালে কার্যত অচল হয়ে পড়ে রাজধানীসহ সারাদেশ। রাজধানীতে সকাল থেকে কিছু লোকাল বাস, সিএনজি ও রিকশা ছাড়া যান চলাচল ছিল খুবই কম। কোনো প্রাইভেট গাড়ি চলেনি। ছেড়ে যায়নি দূরপাল্লার কোনো বাস। এমনকি বাসের কাউন্টারও খোলেনি। বড় বড় মার্কেট, বেসরকারি অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং দোকানপাট ছিল বন্ধ। ব্যাংক বীমা খোলা থাকলেও প্রধান গেট ছিল বন্ধ। অজানা আতঙ্কে অফিস ও জরুরি কাজ ছাড়ায় রাস্তায় বের হয়নি সাধারণ মানুষ। হরতাল সমর্থকদের পক্ষ থেকে কোনো ভাংচুর বা বাধা না থাকায় বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নগরীতে যানবাহন চলাচলের সংখ্যা কিছুটা বেড়ে যায়। হরতালের কারণে এসএসসি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও ইবির ভর্তি পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ। আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর অবমাননাকারী নাস্তিক ব্লগারদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ইসলমী রাজনীতি নিষিদ্ধের ষড়যন্ত্র বন্ধ এবং গত শুক্রবার রাজধানীসহ সারাদেশে মুসল্লিদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশের বেপরোয়া হামলা ও গ্রেফতারের প্রতিবাদে এই হরতালের ঘোষণা দেয় বেশ কয়েকটি ইসলামী দল। গত শনিবার খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা শাহ আহমদুল্লাহ আশরাফ এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন। একই দাবিতে কাল সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচিরও ঘোষণা দেন তিনি। দেশের সর্বজনশ্রদ্ধেয় আলেম ও চট্টগ্রাম হাটহাজারী মাদরাসার মুহতামিম আল্লামা আহমদ শফির নেতৃত্বাধীন হেফাজতে ইসলাম এবং খেলাফত মজলিসের পক্ষ থেকেও পৃথকভাবে রোববার হরতাল কর্মসূচি দেয়া হয়। হরতাল আহ্বানকারী দলগুলো হচ্ছে—খেলাফত আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, ইসলামী ঐক্যজোট, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফতে ইসলামী, ওলামা কমিটি প্রভৃতি। এদিকে আলেমদের ডাকা হরতালে সমর্থন দেয় প্রধান বিরোধী দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ১৮ দলীয় জোটের অন্য শরিকসহ বিভিন্ন ইসলামী দল ও সংগঠন। তবে এসব দল হরতালের সমর্থনে কোনো মিছিল বা পিকেটিং করেনি। হরতালে নৈতিক সমর্থন দিলেও মাঠে ছিল না বিএনপি। দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় পুলিশ অবরুদ্ধ করে রাখে। নেতাকর্মীরা কেউ কেউ কার্যালয়ে এলেও হরতালের পক্ষে কোনো তত্পরতা ছিল না। মানিকগঞ্জে হরতাল সমর্থক-পুলিশ ব্যাপক সংঘর্ষ : পুলিশের গুলিতে নিহত ৫, শিশুসহ গুলিবিদ্ধ ২০, আজ জেলাব্যাপী হরতাল : মানিকগঞ্জ ও সিংগাইর প্রতিনিধি জানান, সিংগাইরে গতকাল ইসলামী সমমনা দলগুলোর হরতাল চলাকালে হরতাল সমর্থনকারী, গ্রামবাসী ও পুলিশের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এতে গুলিবর্ষণ টিয়ারশেল নিক্ষেপ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশের গুলিতে মাদরাসা শিক্ষকসহ ৫ জন নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়েছে শিশুসহ ২০ জন। দু’পুলিশ কর্মকর্তার মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ ও থানার ওসিসহ ৩ পুলিশ আহত হয়েছে । প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকাবাসীরা জানায়, গতকাল সকাল ৯টার দিকে রাস্তা অবরোধ করা নিয়ে কাশিমনগর বাসস্ট্যান্ডে হরতাল সমর্থনকারীদের সঙ্গে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মাজেদ খানের তর্কবিতর্ক হয়। একপর্যায়ে তাকে মারধর করে তারা। এ খবর আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে জড়ো হয়ে তারা সদর বিএনপির কার্যালয়সহ ইসলামী সমমনা দলের সমর্থনকারীদের মারধরসহ দুটি দোকান ভাংচুর করে। এ খবরে সকাল এগারোটার দিকে হরতাল সমর্থনকারীরা গোবিন্দল বাসস্ট্যান্ড নতুন বাজারে সিংগাইর-মানিকগঞ্জ সড়কে যানচলাচল বন্ধ করে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশের সঙ্গে এএসপি সদর সার্কেল মো. কামরুল ইসলামের নেতৃত্বে যোগ দেয় অতিরিক্ত পুলিশ। সংঘর্ষ বাধে পুলিশ ও হরতাল সমর্থনকারীদের মধ্যে। এক পর্যায়ে পুলিশ গুলিবর্ষণ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। পুলিশের ছোড়া গুলিতে বসতবাড়ির টিনের বেড়া ভেদ করে প্রবাসীর স্ত্রী হেলেনা আহত হন। এতে হরতাল সমর্থনকারী ও গ্রামবাসী চারদিক থেকে পুলিশকে ঘেরাও করে। এতে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় ডিবি সদস্য মুজিবর ও পুলিশ কনস্টেবল শাহিন আহত হন। এ সময় পুলিশ ব্যাপক গুলিবর্ষণ করলে গোবিন্দল মাদরাসার শিক্ষক হাফেজ শাহ আলম (২৫), নাজিম উদ্দিন (২৬), আলমগীর (২৫), হেলেনা (২২) ও মাওলানা নাসির উদ্দিন (৩০) নিহত হন। গুলিবিদ্ধ হয় আলী আকবর, লিংকন, নোয়াব আলী, সিদ্দিক, নাজিম উদ্দিন, কালু, দুলাল মিয়া, আলমাস, মানিক, মামুন, আনোয়ার, ওয়াজেদ, শাহিন, রুবেল, রউফ ও শিশু লিটন। নিহত-আহতরা সবাই গোবিন্দল গ্রামের বাসিন্দা। এর মধ্যে নাজিমউদ্দিন স্বেচ্ছাসেবক দল এবং বাকিরা খেলাফত মজলিসের নেতাকর্মী বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। সিংগাইর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো. খলিলুর রহমান জানান, গুলিবিদ্ধ আহতদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এদিকে হরতাল সমর্থনকারীদের ইট-পাটকেলের আঘাতে আহত হয়েছেন সিংগাইর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. লিয়াকত আলী। সে সঙ্গে অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দিয়েছে এসআই আদিল মাহমুদ ও এসআই এমদাদুল হকের ব্যবহৃত দুটি মোটরসাইকেল। পুলিশ ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে। খেলাফত মজলিসসহ ইসলামি দলগুলোর পক্ষ থেকে আজ মানিকগঞ্জ জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন করা হয়েছে। ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি নুরুজ্জামান ও র্যাব ৪-এর কমান্ডিং অফিসার কিসমত হায়াত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এদিকে সিংগাইরে পুলিশের গুলিতে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা নাজিমুদ্দিনসহ চারজন নিহত হওয়ার ঘটনায় সোমবার সকাল-সন্ধ্যা হরতালের সমর্থনে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা। গতকাল বিকাল ৫টায় বিএনপি কার্যালয় থেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিলটি শহর প্রদক্ষিণ শেষে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করে। এতে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শরিফ ফেরদৌসের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন অ্যাডভোকেট জামিলুর রশিদ খান, আতাউর রহমান আতা, মোতালেব হোসেন প্রমুখ । মানিকগঞ্জ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আলী মিয়া দাবি করেন, জামায়াত-বিএনপির কর্মীরা হরতালের নামে দোকানপাট ভাংচুর ও রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ করে। এ সময় পুলিশ বাধা দিতে গেলে হরতালকারীরা পুলিশের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা করে। এতে সিংগাইর থানার অফিসার ইনচার্জ লিয়াকত আলীসহ ১৫ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। জীবন রক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ৫০ রাউন্ড টিয়ারশেল এবং ৩০০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করা হয়। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব মোতায়ন করা হয়েছে। এ ঘটনায় ৭ জন হরতাল সমর্থনকারীকে আটক করা হয়েছে। রাজধানীর কামরাঙ্গীর চর-পুরান ঢাকা : গতকাল কামরাঙ্গীর চর এলাকায় শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালিত হয়েছে। প্রতিদিনের তুলনায় গতকাল ওই এলাকায় গাড়ি চলাচল অনেক কম ছিল। তবে পুলিশ ও র্যাব ফজরের নামাজের পর থেকেই জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া হাফেজ্জী হুজুরের মাদরাসার সামনে অবস্থান নেয়। মাদরাসার আশপাশ এলাকায় ২-৩ জনের বেশি একত্রিত হতে দেয়নি। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মাদরাসা থেকে একটি মিছিল বের হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের বাধার সম্মুখীন হয়। পুলিশ আগেই মিছিল বের না করার কড়া নির্দেশ দিয়ে যায়। পরে মিছিলটি মাদরাসার ভিতরে প্রদক্ষিণ করে। মিছিল শেষে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তারা বলেন, আজকের (রোববার) হরতাল বেঈমানদের বিরুদ্ধে ঈমানদারদের হরতাল। যারা এই হরতালের বিরোধিতা করেছে তারা সবাই নাস্তিক। আল্লাহ এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) বিরুদ্ধে যারা কটূক্তি করেছে তারা মানুষ নয়, তারা বেঈমান পশু। আর যারা তাদের সমর্থন করে তাদের রাজনীতি করার অধিকার নেই। দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমান একজন সত্যের সৈনিক। কোনো নাস্তিক-মুরতাদ আমার দেশ বন্ধ করতে পারবে না। আমরা জনগণ আমার দেশ-এর পাশে আছি, থাকব। খেলাফত আন্দোলনের আমির হজরত মাওলানা শাহ আহম্মদুল্লাহ আশরাফ বলেন, এই হরতাল ডাকা হয়েছে নাস্তিক-মুরতাদদের বিরুদ্ধে। এই হরতাল মারামারি-কাটাকাটি করার জন্য নয়। আমরা কোনো সংঘাতে যাব না। শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল করবো। দলের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী বলেন, এই হরতালে সারা দেশবাসী সমর্থন দিয়েছে। এই হরতাল কোনো সরকারের বিরুদ্ধে নয়। ব্লগারদের পক্ষ নেয়ার কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তাওবা করতে হবে। এই আন্দোলনকে জামায়াতে ইসলামীর আন্দোলন বলে কিছু মিডিয়ার প্রচারণার প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, এই হরতাল হচ্ছে ইসলামি সমমনা ৮ দলের হরতাল। কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা আবু জাফর কাশেমী গ্রেফতার করা তাঁতীবাজার মাদরাসার ছাত্রদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মুক্তি দেয়ার দাবি জানান। সমাবেশ শেষে মাদরাসার মাঠে ব্লগার নাস্তিক ও মুরতাদদের কুশপুত্তলিকা দাহ করে। এদিকে সকাল থেকে পুরান ঢাকায় শান্তিপূর্ণ হরতাল পালন হয়েছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। গুলিস্তান, কাপ্তান বাজার, নবাবপুর, সূত্রাপুর, বাংলাবাজার, বংশাল, সদরঘাট, নয়াবাজার, বাবুবাজার, মিটফোর্ড রোড, চকবাজার, পোস্তা, লালবাগ, আজিমপুর, হাজারীবাগ এলাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দোকানপাটগুলো বন্ধ ছিল। রাস্তায় সিএনজি, টেম্পো চলাচল ছিল। কিন্তু প্রাইভেট কার দেখা যায়নি। রিকশা চলাচলও ছিল স্বাভাবিক। সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী : গতকালের হরতাল স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়েছে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, মানিকনগর, ডেমরা, ধোলাইরপাড়, ধলপুর, কাজলাসহ আশপাশের এলাকায়। এসব এলাকার খাবার হোটেল ও ওষুধের দোকান ছাড়া অন্য কোনো দোকানপাট খোলেননি ব্যবসায়ীরা। সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে একটি বাসও ছেড়ে যায়নি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢাকার বাইরে থেকে একটি বাসও টার্মিনালে আসেনি। যাত্রবাড়ি থেকে মিরপুর ও গাবতলী রুটে কয়েকটি শিকড় ও ৮ নম্বর বাস আসা যাওয়া করেছে। তবে এগুলোর কোনো কোনোটিতে ৮/১০ জন যাত্রী ছিল। কোনটিতে আদৌ কোনো যাত্রী ছিল না। সকাল ১০টায় যাত্রবাড়ি চৌরাস্তায় টিভি ক্যামেরাম্যানদের অনুরোধে স্থানীয় যুবলীগের নেতাকর্মীরা কয়েকটি খালি বাস কয়েকবার যাত্রাবাড়ি ও সায়েদাবাদ এলাকা ঘোরাতে বাধ্য করে। প্রাইভেটকার, ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহন চোখে পড়েনি। সকালের দিকে বেশ কিছু রিকশা চলেছে। তবে দুপুরের দিকে যাত্রী না থাকায় রিকশা চলাচলও কমে আসে। সকালের দিকে ধোলাইরপাড়, কাজলা ও ধলপুরে হরতালের পক্ষে মিছিল হয়। ধলপুরে একটি টেম্পোতে আগুন দেয়া হয়। ধোলাইরপাড় থেকে হরতালের সমর্থনে একটি মিছিল যাত্রাবাড়ির দিকে এগোনোর কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ ও র্যাবের বাধায় তা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় পিকেটারা একটি বাস ও একটি টেম্পো ভাংচুর করে। যাত্রাবাড়িতে হরতাল প্রতিরোধে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের স্থানীয় ৩০-৪০ জন নেতাকর্মী পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির উপস্থিতিতে হকিস্টিক নিয়ে মিছিল করে। দুপুর পর্যন্ত যাত্রাবাড়ি চৌরাস্তায় পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি অবস্থান করে তারা। হরতালে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মহাখালী ও গুলশানের চিত্র : ইসলামি দলগুলোর হরতালে গতকাল মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মহাখালী ও গুলশানে কোনো সহিংসতা হয়নি। মিরপুর ও মোহাম্মদপুরে দুটি ঝটিকা মিছিল বের করে হরতাল সমর্থকরা। ধানমন্ডিতে সকাল ৭টার দিকে মিছিল বের করে সমমনা ইসলামি দল। গাবতলী ও মহাখালী থেকে অতি ভোরে ৪/৫টি দূরপাল্লার গাড়ি ছেড়ে গেলেও তা ছিল যাত্রীশূন্য। তবে সাড়ে ৬টার পর দূরপাল্লার কোনো গাড়ি ছেড়ে যায়নি। মিরপুর এলাকায় কোনো সংঘর্ষ না হলেও মিরপুর এক নম্বরের দিকে ঝটিকা মিছিল করেছে। তবে পুরো ঢাকায় গতকাল পুলিশ ও র্যাব নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে বেশ সতর্ক অবস্থানে ছিল। সর্বদা বন্দুক তাক করে তারা টহল দিয়েছে। র্যাব-পুলিশের সংখ্যা ছিল অন্য হরতালের চেয়ে অনেক বেশি। এতে প্রতিটি এলাকায় অফিসগামী মানুষের মাঝে আতঙ্ক দেখা দেয়। বাড়তি আতঙ্ক ছড়ায় সরকারি দলের নেতাকর্মীদের লাঠি-রডের মহড়া ও হরতালবিরোধী মিছিল। থেমে থেমে রাজধানীর সব স্ট্যান্ডে তারা মিছিল করেছে। মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে জমায়েত হয়ে ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের কর্মীরা হরতালবিরোধী মিছিল করে। স্থানীয় এমপি কামাল মজুমদারের নেতৃত্বে লাঠি মিছিল করে তারা। মতিঝিল, পল্টন, খিলগাঁও ও মগবাজার : হরতাল প্রতিরোধে মতিঝিল, পল্টন, খিলগাঁও এবং মগবাজারসহ আশপাশের এলাকায় কঠোর অবস্থানে ছিল র্যাব ও পুলিশ। এসব এলাকায় তেমন কোনো পিকেটিং দেখা যায়নি। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মতিঝিল কমলাপুর থেকে জসিমউদ্দিন সড়কে ঝটিকা মিছিল করে সমমনা ১২ দল। দুপুরের দিকে পল্টন তোপখানা রোডে একটি ককটেল বিস্ফোরণের খবরে ওই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে সেখানে কোনো পিকেটিং বা মিছিল হয়নি। ১০টার দিকে হরতালবিরোধী একটি মিছিল থেকে পল্টন মোড়ে ইসলামি ব্যাংকের সাইনবোর্ডে ঢিল ছোড়া হয়। সকাল ৮টার দিকে খিলগাঁও শাহজাহানপুরে পিকেটিং করে ইসলামি দলের কিছু কর্মী। এ সময় পুলিশ তাদের ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেয়। একই সময়ে উত্তর শাহজাহানপুর মাদরাসার পাশে কিছু ছাত্র জড়ো হলে পুলিশ তাদেরও ধাওয়া দেয়। মগবাজার, পল্টনসহ বিভিন্ন এলাকায় লাঠিহাতে হরতালবিরোধী মিছিল বের হয়। হরতাল সফলে অভিনন্দন ও নতুন কর্মসূচি ঘোষণা : ইসলামি দলগুলোর ডাকা হরতাল স্বতঃস্ফর্ত ও শান্তিপূর্ণভাবে সফল করায় সবাইকে অভিনন্দন জানিয়েছেন খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা শাহ আহমদুল্লাহ আশরাফ। হরতাল শেষে বিকালে কামরঙ্গীরচর মাদরাসায় আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি হরতাল চলাকালে পুলিশের বেপরোয়া গুলিতে মানিকগঞ্জে ৫ জন নিহত এবং সারাদেশে নেতাকর্মী ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ওপর হামলা ও গ্রেফতারের প্রতিবাদে আজ মানিকগঞ্জ জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল, সারাদেশে বিক্ষোভ পালন, সব শহীদ ও আহতদের জন্য দোয়া এবং রোজা রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে মসজিদে মসজিদে কুনুতে নাযেলা পড়ে দোয়া অব্যাহত রাখার জন্যও ইমামদের প্রতি আহ্বান এবং ২৬ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নাস্তিক-মুরতাদ ব্লগারদের ইসলামবিরোধী তত্পরতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সারাদেশে গণসংযোগ করার জন্য আলেম-ওলামা, নেতাকর্মী ও নবীপ্রেমিকদের প্রতি আহ্বান জানান। ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নাস্তিক-মুরতাদ ব্লগারদের গ্রেফতার করে শাস্তি প্রদান এবং খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা জাফরুল্লাহ খানসহ এই আন্দোলনে গ্রেফতারকৃত সবার নিঃশর্ত মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার না করলে ১ মার্চ বাদজুমা দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও দোয়া দিবস পালন করা হবে। নেতারা জানান, ওইদিনের বিক্ষোভ শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বিশ্বনবীর (সা.) প্রেমিকরা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেবে ইনশাআল্লাহ। প্রেস ব্রিফিংয়ে বলা হয়, কিছু পত্রিকা ও ইলেট্রনিক মিডিয়ায় নাস্তিকদের পক্ষ নিয়ে উস্কানি ও বিভ্রান্তিমূলক সংবাদ প্রচার বন্ধ না করলে ১ মার্চ থেকে তাদের এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর পণ্য বর্জন করার জন্য দেশবাসীকে আহ্বান জানানো হবে। এদিকে হরতাল সফল করায় বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকে দেশবাসীকে অভিনন্দন জানানো হয়েছে।
বৃদ্ধের দাড়ি ধরে টানা সেই ছাত্রলীগ ক্যাডারও লগি-বৈঠার খুনি স্টাফ রিপোর্টার মোফাচ্ছেরে কোরআন ও আলেমদের ডাকা কর্মসূচিতে সশস্ত্র হামলকারী ক্যাডারদের একজন শাহরিয়ার। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি তাকে পুলিশ বেষ্টনীতে এক বৃদ্ধের দাড়ি ধরে টানাহেঁচড়া করে কিলঘুষি মারতে দেখা যায়। কিছু মিডিয়ায় ‘জনতার গণপিটুনি’ বলে রাজপথে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসকে বৈধতা দিলেও আমার দেশ-এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, ছাত্রলীগ ক্যাডার শাহরিয়ার (২৮) একজন চিহ্নিত খুনি। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠার তাণ্ডবে মানুষ মেরে উল্লাসকারীদের অন্যতম সে। ওইদিন নিহত শহীদের পরিবার ছাড়াও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা আমার দেশকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠার তাণ্ডবের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা শাহরিয়ার নিজেও এ প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করে। এর আগে শাহবাগের কথিত ব্লগারদের আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী বাপ্পাদিত্য বসু ২৮ অক্টোবরের ভয়ঙ্কর খুনি বলে আমার দেশ-এ সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। শাহরিয়ার রাজধানীর সবুজবাগ থানাধীন বাসাবো-কদমতলা-রাজারবাগ অঞ্চল নিয়ে গঠিত ৫নং ওয়ার্ড এলাকায় চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিজের শিক্ষাজীবন অষ্টম শ্রেণীতে শেষ হলেও এখন সে আলোচিত ব্লগার ও ছাত্রনেতা। শাহবাগ আন্দোলনে ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) ছাত্রলীগের নেতৃত্বদানকারী। আওয়ামী লীগ নেতা সাবের হোসেন চৌধুরীর আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় অছাত্র মোস্তাফিজুর রহমান শাহরিয়ার মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের পদবিধারী নেতাও। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সে এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করে। এলাকার বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ্যে জুয়ার আড্ডা বসায়। তার কথা না শুনলে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করে। সম্প্রতি রাজারবাগ পানির পাম্প সংলগ্ন এলাকায় জমি দখল করতে গিয়ে স্থানীয় জনতার ধাওয়া খেয়ে দলবলসহ পালিয়ে আসতে হয় শাহরিয়ারকে। চাঁদাবাজির অভিযোগে এ সরকারের আমলেই র্যাব তাকে একবার গ্রেফতার করেছিল। পরে ওপর মহলের তদবিরে ছেড়ে দেয়া হয়। তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগে মামলা নেয় না সবুজবাগ থানা পুলিশ। তবে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করেছে শাহরিয়ার। তবে ২৮ অক্টোবর পল্টনে সক্রিয় ছিল জানিয়ে এ প্রতিবেদককে সে জানায়, ‘ওইদিন মাঠে ছিলাম। এ ঘটনায় মামলা হইছে, মারও খাইছি। তো তাতে কি হয়েছে।’ তবে সবুজবাগ থানা পুলিশ বলেছে, তারা শাহরিয়ারের ২৮ অক্টোবরের মারামারিতে জড়িত থাকা বা চাঁদাবাজির বিষয়ে কিছুই জানে না। তাদের দাবি, ‘সে খুবই ভালো লোক’। ১৩ ফেব্রুয়ারি আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তি দাবিতে বায়তুল মোকাররমের সামনে অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করে ‘মাওলানা সাঈদী মুক্তিমঞ্চ’। সেদিন ভোরেই বায়তুল মোকাররম, মতিঝিলসহ পুরো এলাকা দখলে নেয় র্যাব ও পুলিশ। সকালে পুলিশ পাহারায় মাওলানা সাঈদীর মুক্তি দাবিতে রাজপথে নামা আলেম, জনতা ও জামায়াত-শিবির কর্মীদের ব্যাপক মারধর করে যুবলীগ-ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। অনেক নিরীহ পথচারীও বর্বর হামলার শিকার হন। সেদিন পুলিশের বেষ্টনীতে থাকা একজন বৃদ্ধ পথচারীর সাদা দাড়ি টেনে ধরে তাকে উপর্যুপরি কিল-ঘুষি মারে অছাত্র ছাত্রলীগ ক্যাডার শাহরিয়ার। কিছু আওয়ামীপন্থী গণমাধ্যমে এসব হামলাকে ‘জনতার হামলা’ বলে বৈধতা দেয়ার প্রয়াস চালানো হয়। তবে আমার দেশ-এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে শাহরিয়ার মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের ক্রীড়া সম্পাদক। ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠার চিহ্নিত এ খুনির বিরুদ্ধে রয়েছে চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ। কে এই ব্লগারবেশী শাহরিয়ার : ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে প্রকাশ্যে ছুরি দিয়ে মানুষ হত্যার ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। ওইদিনের হামলায় নিহত হন ৫নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা শিবির নেতা হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপন ও সাইফুল্লাহ মুহাম্মদ মাসুম। এ দুই শহীদের স্বজনরা ছাত্রলীগ নেতা মুস্তাফিজুর রহমান শাহরিয়ার ২৮ অক্টোবর সশস্ত্র হালাকারীদের একজন বলে এ প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেন। তারা জানান, একই এলাকার হওয়ায় মাসুম ও শিপনের সঙ্গে আগে থেকেই পরিচয় ছিল শাহরিয়ারের। সেই শাহরিয়ারই ওইদিন মানুষ খুনে নেতৃত্ব দেয়। তবে তারা শাহরিয়ারের ব্যাপারে বিস্তারিত বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। ঘটনার পরদিন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হুকুমের আসামি করে একটি হত্যা মামলা (মামলা নং-৬১ (২৯/১০/০৬) হয়। সে মামলার একজন আসামি শাহরিয়ার। এছাড়া শহীদ মাসুম-শিপন স্মৃতি সংসদের পক্ষে বের করা ‘শাহাদাত দেবে মুক্তি’ শীর্ষক বুকলেটে লালবৃত্তে চিহ্নিত করা আছে শাহরিয়ারের ছবি। ছবির ক্যাপশনে লেখা রয়েছে—‘২৮ অক্টোবর ২০০৬ পল্টন মোড়ে এভাবেই এক শিবির কর্মীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যার চেষ্টা চালায় কদমতলা-রাজারবাগ এলাকার সন্ত্রাসী ২৮ নং ওয়ার্ড (বর্তমান ৫ নং ওয়ার্ড) ছাত্রলীগ কর্মী শাহরিয়ার।’ এর বাইরে ওই হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন বুকলেট ও পত্রিকায় শাহরিয়ারের ছবি রয়েছে। বাসাবো-রাজারবাগ এলাকায় সরেজমিন অনুসন্ধান করে জানা যায়, ২৮ অক্টোবর মানুষ খুনের প্রতিদান হিসেবে ৫ নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সভাপতি করা হয় শাহরিয়ারকে। পরে ২০১১ সালে সরকার দলীয় এমপি সাবের হোসেনের আশীর্বাদে ওয়ার্ড সভাপতি থেকে সরাসরি মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের ক্রীড়া সম্পাদক হন। এলাকায় তাকে মদত দেয় ৫ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শ্রী চিত্তরঞ্জন দাশ। ওই এলাকায় চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্ম করে বেড়ান তিনি। রমজানে দলের ইফতারের টাকা মেরে খাওয়ার অভিযোগ পর্যন্ত উঠেছে তার বিরুদ্ধে। তার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া উপজেলার সতুরা শরীফে। চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। বড় ভাই হিরু এলাকার সন্ত্রাসী এবং বোমা মামলাসহ একাধিক মামলার আসামি। এলাকাবাসী জানায়, রাজারবাগ বাজারে জেরিন মার্কেটে একটি ক্লাব রয়েছে তার, যেখানে প্রতিদিন প্রকাশ্যে জুয়া খেলা চলে। এ জায়গাটি এলাকাবাসীর কাছে মাদকের আখড়া বলে পরিচিত। এখানেই বসে সন্ত্রাসীদের আড্ডা। পুলিশের নাকের ডগায় এসব ঘটলেও পুলিশ অনেকটা দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবুজর গিফারী কলেজের ক্যান্টিনটি নিজের দখলে নেন তিনি। নিম্নমানের খাবার দিয়ে অতিরিক্ত মূল্য নিলেও শিক্ষার্থীরা এর কোনো প্রতিবাদ করতে পারছেন না। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সবুজবাগ থানা পুলিশের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে শাহরিয়ারের। পুলিশের যোগসাজশেই তিনি এসব অপকর্ম করে বেড়ান। তাই পুলিশের ভয়ে তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে চায় না। গত চার বছরে বিরোধী বহু নেতাকর্মীকে পুলিশ দিয়ে নাজেহাল করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পুলিশের ভয় দেখিয়ে অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন তিনি। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিশেষ করে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের বাসায় পুলিশ নিয়ে হানা দিয়ে তাদের ধরিয়ে দেন। জানতে চাইলে মুস্তাফিজুর রহমান শাহরিয়ার বলেন, দল শাহবাগের আন্দোলনকে সমর্থন করেছে। তাই আমরা গিয়েছি। আমি মূলত ক্রিকেট খেলি। আওয়ামী লীগ ভালো লাগে তাই করি। কোনো রকমের চাঁদাবাািজর সঙ্গে আমি জড়িত নই। দল করে বড় কোনো নেতা হওয়ার খায়েশও নেই। ২৮ অক্টোবর পল্টনে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের কর্মীদের মধ্যে হওয়া মারামারিতে অংশ নিয়েছেন স্বীকার করে তিনি বলেন, ওইদিন মারামারিতে ছিলাম। মামলা হইছে, জেল খাটছি। মাইর খাইছি। ‘আপনি তো ছাত্র না, তারপরও কীভাবে ছাত্রলীগের নেতা’—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় অফিসে আমার সিভি দেয়া আছে। দেখে নেবেন আমি ছাত্র কি-না। তিনি বলেন, ‘অভয় বিনোদনী স্কুলে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছি আমি। পরে অন্য স্কুল থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করি।’ কোন স্কুল থেকে পাস করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, তা বলতে পারব না। আপনি দেখি আমার অনেক কিছুই খুঁজে বের করেছেন। এটাও জেনে নিন, পাবেন। এ বিষয়ে সবুজবাগ থানার ওসি বাবুল মিয়ার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অপারেশন অফিসার আহসান হাবিব খান বলেন, তার ব্যাপারে কোনো অভিযোগ আমরা এখন পর্যন্ত পাইনি। আমি তো জানি সে খুবই ভালো লোক। আমি শুধু তার রাজনৈতিক বিষয়গুলো জানি। তিনি বলেন, আমার জানা মতে তিনি ভালো। ক্লাবে জুয়ার আড্ডা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বলেন, ক্লাবে কিছু হয় কিনা জানি না। আমি নিজে কখনও ক্লাবে যাই না। অভিযোগ পেলে খোঁজ নিয়ে দেখব। আপনি ওসি সাহেবকেও ব্যাপারটা জানান।

Sunday, 1 January 2012

ইনশাল্লাহ বলায় জিএমজি’র এয়ার হোস্টেসকে ক্ষমা চাইতে হলো













কাদের গনি চৌধুরী
বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থা জিএমজি এয়ারলাইন্সে ‘ইনশাল্লাহ’ ও ভ্রমণের দোয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ‘ইনশাল্লাহ’ বলায় সিনিয়র এক এয়ার হোস্টেসের চাকরি যায় যায় অবস্থা। ওই এয়ার হোস্টেসকে এর জন্য শোকজ করা হয়েছে। লিখিতভাবে ক্ষমা চেয়ে তিনি চাকরিচ্যুতি থেকে আপাতত রক্ষা পেয়েছেন। অন্যদেরও চিঠি দিয়ে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন জিএমজির ভারতীয় কর্মকর্তা এওয়ার্ড একলেসটন। এদিকে ‘ইনশাল্লাহ’ ও ভ্রমণের দোয়া নিষিদ্ধ হওয়ায় বাংলাদেশী যাত্রীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
জিএমজি এয়ারলাইন্সের একটি সূত্র জানায়, নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি থেকে জিএমজির সব ফ্লাইটে ‘ইনশাল্লাহ’ এবং ভ্রমণের দোয়া ‘বিসমিল্লাহে মাজরেহা ওয়া মুরসাহা ইন্না রাব্বিলা গাফুরুর রাহিম’ পাঠ নিষিদ্ধ করা হয়। এর আগে অন্যান্য এয়ারলাইন্সের মতো জিএমজির ফ্লাইট যাত্রা শুরু এবং ল্যান্ড করার আগে ভ্রমণের দোয়া ও ‘ইনশাল্লাহ অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা যাত্রা শুরু করছি’ এসব ঘোষণা থাকত। কিন্তু একচেটিয়া ভারতীয় কর্মকর্তা নিয়োগের পর আল্লাহর নামে যাত্রা শুরু করার ঘোষণা নিষিদ্ধ করার মতো ধৃষ্টতা দেখালো জিএমজি। ফলে শুধু যাত্রীই নয়, তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে জিএমজির বাংলাদেশী অফিসারদের মধ্যেও।
এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১৭ নভেম্বর দুবাই থেকে জিএমজির একটি ফ্লাইট ঢাকায় আসছিল। ওই ফ্লাইটের ঘোষণার দায়িত্বে ছিলেন পার্সার সাবেরা ফেরদৌসী। বরাবরের মতো তিনি ওইদিনও ঘোষণা করেন ‘ইনশাল্লাহ’ অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা ঢাকা হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করব। ওই ফ্লাইটে ছিলেন জিএমজির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার ভারতীয় নাগরিক এওয়ার্ড একলেসটন। এ ঘোষণা শোনার পর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন তিনি। ঢাকায় ফিরে ১ ডিসেম্বর তিনি শোকজ করেন পার্সার সাবেরা ফেরদৌসীকে। শোকজ লেটারে বলা হয়, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার মারুফা মাহফুজ আপনাকে আপডেট ঘোষণা ব্রিফ করার পরও আপনি আগের ঘোষণা পাঠ করেছেন। এতে আপনার উদাসীনতার প্রমাণ মেলে যা শৃঙ্খলাভঙ্গজনিত অপরাধ।
অবশ্য চিঠিতে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে অতীতের ভালো পারফরম্যান্সের জন্য সতর্ক করে দেয়া হয়। ১৮ ডিসেম্বর শোকজের জবাব দেন সাবেরা ফেরদৌসী। জবাবে তিনি তার ঘোষণায় আগের মতো ইনশাল্লাহ বলায় আন্তরিকভাবে ক্ষমা চান। তিনি এ ধরনের ভুল আর করবেন না বলেও অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
শুধু সাবেরা ফেরদৌসীই নন, আরও বেশ ক’জন এয়ার হোস্টেসকে ইনশাল্লাহ বলায় জিএমজি কর্তৃপক্ষের বকুনি খেতে হয়েছে। জিএমজির ট্রেনিং ইনস্ট্রাকটর ফারহানা জুলি ঘোষণায় যেন ‘ইনশাল্লাহ’ ও ভ্রমণের দোয়া পাঠ করা না হয়, সেজন্য সব কেবিন ক্রুকে মেসেজ পাঠিয়েছেন।
এ ব্যাপারে ট্রেনিং ইনস্ট্রাকটর ফারহানা জুলির কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুধু কলকাতার ফ্লাইটের ক্ষেত্রে এ নিয়ম করা হয়েছে, অন্য ফ্লাইটে ঠিক আছে। কলকাতা যেতে অল্প সময় লাগে, তাই এত বড় ঘোষণা দিলে অনেকে বিরক্ত হন। তাহলে দুবাই থেকে আসা ফ্লাইটে ‘ইনশাল্লাহ’ ও ভ্রমণের দোয়া পাঠ করায় কেন শোকজ করা হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি ঠিক নয়। সাবেরা ফেরদৌসী গতকালও ফ্লাই করেছেন। আপনার কথা শুনে আমি আশ্চর্য হচ্ছি।
জিএমজির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার এওয়ার্ড একলেসটন এবং পার্সার সাবেরা ফেরদৌসীর বক্তব্য জানার জন্য ফোন করে তাদের পাওয়া যায়নি।
বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থা জিএমজি এয়ারলাইন্স লিমিটেডের শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখল করে আছে ভারতীয়রা। ফলে বাংলাদেশী দক্ষ কর্মকর্তারা বেকার ও পদোন্নতিবঞ্চিত হচ্ছেন। জিএমজির একটি সূত্র জানায়, শীর্ষ ১৬ পদের মধ্যে ৯টি পদই ভারতীয়দের দখলে। বাকি দুটিতে আমেরিকান, একটিতে ব্রিটিশ, একটিতে শ্রীলঙ্কান, একটিতে ফিলিপিনো এবং দুটিতে বাংলাদেশী কর্মকর্তা রয়েছেন। এসব বিদেশি কর্মকর্তাদের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে জিএমজি এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষকে। আর এভাবে দেশের অর্থ চলে যাচ্ছে বিদেশে।
জিএমজির প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ করছেন ভারতীয় নাগরিক সঞ্জীব কাপুর। এখানে দায়িত্বভার গ্রহণ করার আগে তিনি ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান বেইন অ্যান্ড কোম্পানিতে কাজ করেছেন। এর আগে তিনি তেমাসেক হোল্ডিংসের (সিঙ্গাপুর) ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড পোর্টফোলিওর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্ট এয়ারলাইন্সে স্ট্র্যাটেজি, ফাইন্যান্স অ্যান্ড অপারেশন্সের পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ডাইরেক্টর কমার্শিয়াল হিসেবে জিএমজি নিয়োগ করেছে ভারতীয় নাগরিক শিল্পা ভাটিয়াকে। কমার্শিয়াল বিষয়ে শিল্পার অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তাকে লোভনীয় বেতনে চাকরি দেয় জিএমজি। এছাড়া ডাইরেক্টর ইঞ্জিনিয়ারিং হিসেবে ভারতীয় নাগরিক বারিন ঘোষ দাস্তিদার, ডাইরেক্টর গ্রাউন্ড সার্ভিস পদে শাইলেস শর্মা, সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার কেবিন সার্ভিস পদে এওয়ার্ড একলেসটন, সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার ক্যাটারিং পদে রাজিব ঘাই, সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার অপারেশন্স নাইডু, এজিএম অপারেশন্স বন্দনা, ডাইরেক্টর সেফটি পদে আরএল কাপুরকে নিয়োগ দিয়েছে জিএমজি। এদের মধ্যে সত্তরোর্ধ্ব আরএল কাপুর ভারতে চাকরি জীবন শেষে অবসর কাটাচ্ছিলেন। তাকে মোটা বেতনে চাকরি দেয় জিএমজি। এওয়ার্ড একলেসটনকে জিএমজি ৭ হাজার ডলার অর্থাত্ বাংলাদেশী টাকায় প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা বেতন দিচ্ছেন। অথচ জিএমজিতে চাকরির আগে তিনি জেড এয়ারওয়েজের কলকাতা অফিসের রিক্রুটার ছিলেন। কেবিন সার্ভিসে পূর্বঅভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তাকে সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার কেবিন সার্ভিস পদে নিয়োগ দেয় সংস্থাটি।
জিএমজির দ্বিতীয় প্রধান পদ চিফ অপারেটিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে ব্রিটিশ নাগরিক ডেভিডকে। ডাইরেক্টর ফ্লাইট অপারেটর (ডিএফও) পদে আমেরিকান নাগরিক জ্যাক একেল ও জেনারেল ম্যানেজার প্ল্যানিং পদে জেনিস, জেনারেল ম্যানেজার কোয়ালিটি পদে ফিলিপিনো ডার্ক এবং জিএম কার্গো পদে শ্রীলঙ্কান অরুণাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, বিদেশি কর্মকর্তারা একজোট হয়ে যে ক’জন বাংলাদেশী কর্মকর্তা রয়েছেন, তাদের কোণঠাসা করে রেখেছেন। তারা কর্তৃপক্ষকে সবসময় বাংলাদেশীদের বিরুদ্ধে ভুল বোঝান। সূত্র জানায়, বোয়িং ৭৬৭-এর জন্য ৮ জন বাংলাদেশী পাইলট সুইডেন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসেন ৪ সেপ্টেম্বর। নিয়ম অনুযায়ী এরপর তাদের বাংলাদেশ লাইনে প্রশিক্ষণ নিতে হয়। অথচ ডিএফও জ্যাক এই ট্রেনিং স্লো চালিয়ে তাদের কাজে যোগদান থেকে দূরে রাখছেন। সূত্র জানায়, বিদেশি পাইলটদের দিয়ে এয়ারক্রাফট চালানোর জন্য তিনি এমন চাতুরির আশ্রয় নিয়েছেন। এতে দেশের প্রচুর অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। সূত্র জানায়, বাংলাদেশী একজন পাইলটকে যেখানে ৫ হাজার ডলার বেতন দেয়া হয়, সেখানে বিদেশি একজন পাইলটকে দিতে হয় ১৪ হাজার ডলার।
বাংলাদেশের বৃহত্তম ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বেক্সিমকোর মালিকানাধীন কোম্পানি জিএমজি এয়ারলাইন্স ১৯৯৮ সালের ৬ এপ্রিল বাণিজ্যিকভাবে যাত্রা শুরু করে। অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করলেও ২০০৪-এর ৬ এপ্রিল চট্টগ্রাম-কলকাতা রুটে ফ্লাইট পরিচালনার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বিমান আকাশে পদচারণা শুরু হয় জিএমজির। আটটি আন্তর্জাতিক এবং পাঁচটি অভ্যন্তরীণ রুটে সপ্তাহে ২৩৪টি ফ্লাইট পরিচালনা করছে জিএমজি এয়ারলাইন্স। জিএমজি আন্তর্জাতিক রুট কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক, কাঠমান্ডু, কলকাতা, দুবাই, আবুধাবি, জেদ্দা ও রিয়াদ এবং অভ্যন্তরীণ রুটে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট এবং যশোরে তাদের ফ্লাইট পরিচালনা করে থাকে। জিএমজি বর্তমানে তিনটি বোয়িং ৭৬৭ ও তিনটি ম্যাকডগলাস এয়ারক্রাফট আঞ্চলিক রুটে এবং তিনটি কানাডিয়ান বোম্বার্ডিয়ার ড্যাশ-৮ দিয়ে অভ্যন্তরীণ ও কলকাতা রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। তবে কিছুদিন ধরে কয়েকটি আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ রেখেছে তারা।
সূত্র জানায়, বিদেশিদের মোটা অংকের বেতন দিতে গিয়ে এবং পরিকল্পনার অভাবে জিএমজির আর্থিক অবস্থান বর্তমানে ভালো নয়। ফ্লাইটের আকারও কমে গেছে। এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে দুবাই, আবুধাবি, রিয়াদ ও জেদ্দা রুটের ফ্লাইট।

জৈন্তাপুরে ফের উত্তেজনা ডিবির হাওরে মাছ ধরতে বিএসএফের বাধা

জৈন্তাপুর (সিলেট) প্রতিনিধি

সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্তে বিজিবি বিএসএফ’র মধ্যে আবারও উত্তেজনা বিরাজ করছে। বংলাদেশী মত্স্যজীবীরা ডিবির হাওরে মাছ ধরতে গেলে বিএসএফ বাধা দেয়ায় এ উত্তেজনা দেখা দেয়। দু’পক্ষের পতাকা বৈঠক হলে মাছ ধরা বন্ধ হয়ে যায়।
জৈন্তাপুর গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্ত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিজিবি-বিএসএফ’র মধ্যে নানামুখী বিরোধ ও সংর্ঘষ চলে আসছিল। ভারতীয়রা বাংলাদেশী সীমান্ত এলাকায় জোর করে ভূমি দখল, পাকা ধান কেটে নেয়া, বিলের মাছ ধরে নিয়ে যাওয়া, কৃষকের হালের গরু ধরে নিয়ে যাওয়া, কৃষক ও শ্রমিকদের ধরে নিয়ে হত্যা ও নির্যাতন করা, সবজিক্ষেত পুড়িয়ে ফেলাসহ নানা অপকর্ম চালিয়ে আসছিল ভারতীয় বিএসএফ ও খাসিয়ারা। এসব বিষয় নিয়ে সীমান্ত এলাকায় একাধিকবার উভয়দেশের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে বাংলাদেশের শতাধিক লোক আহত হন। গত দুই বছরে শ্রমিক, কৃষকসহ প্রায় ৭ জন নিহত হন, আহত হন শতাধিক। এ নিয়ে সীমান্ত এলাকায় দলমত নির্বিশেষে সীমান্ত রক্ষার দাবিতে ও ভারতীয়দের নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে সীমান্তবাসী বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম করতে থাকে। রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ১৫ অক্টোবর জাফলংয়ে এক সভায় বলেন, ডিবির হাওর সীমান্ত ভূমি আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এক ইঞ্চিও ভারতকে দেবে না। যারা বলছে সীমান্তের ভূমি ভারত নিয়ে গেছে আসলে তারা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য আন্দোলন করছে। তিনি আরও বলেন, ডিবির হাওরের ভূমি আমি জৈন্তাবাসীকে উপহার দিয়ে গেলাম। এ ঘোষণায় ডিবির হাওর সীমান্ত এলাকার মত্স্যজীবীরা আনন্দে উত্ফুল্ল হয়ে ২৪ ডিসেম্বর ১২৮৪নং পিলারের ৪শ’ গজ ভেতরে মাছ ধরতে গেলে বিএসএফ দলবল নিয়ে বাংলাদেশী মত্স্যজীবীদের তাড়িয়ে দেয়। সংবাদ শুনে ডিবির হাওর সীমান্তের বিজিবি ক্যাম্প কমান্ডার নায়েব সুবেদার নজরুল ইসলাম ঘটনাস্থলে গেলে বিজিবি বিএসএফ’র মধ্যে বাক-বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে পতাকা বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়।
গতকাল ১২৮৫নং পিলারের বিজিবি বিএসএফ’র মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত এ বৈঠক চলে। বৈঠকে বিজিবির পক্ষে নেতৃত্ব দেন ডিবির হাওর ক্যাম্প কমান্ডার নায়েব সুবেদার নজরুল ইসলাম, হাবিলদার আমানউল্লাহ। বিএসএফ’র পক্ষে মুক্তাপুর ক্যাম্প কমান্ডার রাম কিশান, হাবিলদার অতুল বর্মণসহ উভয়দেশের ১৫-২০ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক চলাকালে উভয়দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে ছিল।
বৈঠক শেষে বিজিবি ক্যাম্প কমান্ডার নজরুল ইসলাম বৈঠক সফল হয়েছে বলেন। তবে তিনি বলেন, ভারতীয়রা ডিবির হাওর ক্যাম্পের সীমানা পর্যন্ত দাবি করে। তাদের দাবি প্রত্যাখ্যান করে তিনি বিরোধপূর্ণ বিলের ভূমি নিয়ে উচ্চপর্যায়ে সমাধানের কথা বলেন। সমাধান না হওয়া পর্যন্ত উভয়দেশের লোকজনকে বিলে মাছ ধরতে নিষেধ করেছেন।
এ বিষয়ে ডিবির হাওর এলাকার সুলেমান মিয়া, আবদুল মালেক, ইসমাইল মিয়া বলেন, আওয়ামী লীগের নেতারা বলেছেন সীমান্তে কোনো সমস্যা নেই। সুরঞ্জিত বাবু জাফলংয়ের সভায় ডিবির হাওরের বিল জৈন্তাবাসীকে উপহার দিয়ে গেছেন। তার উপহার পেয়ে আমরা খুশি হয়ে বিলে মাছ ধরতে যাই। কিন্তু বিএসএফ আমাদের বাধা দেয়। এ উপহার দিয়ে আমাদের কী লাভ হলো। বিলে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে উভয়দেশের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
http://www.amardeshonline.com/pages/details/2011/12/27/124199

Monday, 19 December 2011

বিএসএফের গুলিতে ৪ বাংলাদেশি নিহত

অনলাইন ডেস্ক | তারিখ: ১৭-১২-২০১১
কুড়িগ্রাম, মেহেরপুর ও দিনাজপুরের বিরামপুর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে আজ শনিবার ও গতকাল শুক্রবার চার বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।
কুড়িগ্রাম: জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার গোড়ক মণ্ডল সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে আজ শনিবার ভোরে আলমগীর ইসলাম (২৫) নামের এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।
স্থানীয় নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোসাব্বর হোসেন মুসা জানান, আলমগীর কৃষ্ণানন্দ বকশী গ্রামের কৃষক ইসমাইল হোসেনের ছেলে। তিন সহযোগীসহ গরু নিয়ে আসার সময় বিএসএফের গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়।
শিমুলবাড়ী বিজিবি বিওপির কমান্ডার সুবেদার নিজাম উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
মেহেরপুর: জেলার মেহেরপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে গতকাল শুক্রবার রাতে নাহারুল হোসেন (৩৫) নামের এক বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। তাঁর বাড়ি মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া ইউনিয়নের শাওড়াতলা গ্রামে।
নিহতের বাবা বিশারদ হোসেন জানান, গতকাল রাত আটটার দিকে নাহারুল সেচকাজ করতে জমিতে যান। এর কিছুক্ষণ পরই সীমান্তে গুলির শব্দ শুনে তিনি সেখানে যান। কিন্তু ততক্ষণে বিএসএফ লাশ ভারত সীমান্তের ভেতরে নিয়ে যায়।
তেঁতুলবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজমুল হুদা বিএসএফের গুলিতে একজনের মৃত্যুর বিষয় নিশ্চিত করেছেন।
বিজিবির ৩২ ব্যাটালিয়ন কমান্ডার ও মিরপুর সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল হামিদুন নবী চৌধুরী বলেন, শাওড়াতলা সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে একজন বাংলাদেশি মারা গেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বিএসএফ কেন এ ঘটনা ঘটাল, তা তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনা শুনে বিজিবি লাশ ফেরত চেয়ে বিএসএফকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছে।
দিনাজপুর: দিনাজপুরের বিরামপুর সীমান্তে গতকাল শুক্রবার রাতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। বিএসএফ দুজন বাংলাদেশি নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করে বলেছে বিকেলে চিঠি দিয়ে জানানো হবে কখন তাঁদের লাশ হস্তান্তর করা হবে।
নিহত দুজন হলেন, কাটলা সীমান্তের দাউদপুর গ্রামের মো. মতিয়ার রহমান (২০) এবং রণগ্রামের মো. তাইজুল ইসলাম (২৬)।
আজ শনিবার দুপুরে দুই দেশের মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের পরে বিএসএফের ১২৩ ব্যাটালিয়নের আগ্রা ক্যাম্পের কমান্ডার রাকেশ কুমার বলেন, সীমান্তে বাংলাদেশের গরু ব্যবসায়ীরা তাঁদের ওপর হামলা চালায়। এরপরে বিএসএফ তাঁদেরকে লক্ষ্য করে চারটি গুলি ছোড়ে। এতে দুই বাংলাদেশি নিহত হন।
এদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ভাইগড় ক্যাম্পের কমান্ডার আবদুল কাদের বীর বলেন, এ ঘটনায় বিজিবির পক্ষ থেকে বিএসএফের কাছে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
http://www.eprothomalo.com/index.php?opt=view&page=1&date=2011-12-18

Wednesday, 23 November 2011

বেনাপোল সীমান্তে বিএসএফের পিটুনিতে ব্যবসায়ীর মৃত্যু : দৌলতপুরে কৃষককে অপহরণ

ডেস্ক রিপোর্ট

যশোরের বেনাপোলের পুটখালী সীমান্তে এক গরু ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে বিএসএফ সদস্যরা। অন্যদিকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্ত এলাকা থেকে তারা ধরে নিয়ে গেছে এক কৃষককে। বিস্তারিত আমার দেশ প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
বেনাপোলে ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যা : বেনাপোলের পুটখালী সীমান্তে বাতেন আহম্মেদ নামে বাংলাদেশী এক গরু ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে বিএসএফ। গতকাল ভোরে এ ঘটনা ঘটে।
পুটখালি বিজিবি ক্যাম্পের কমান্ডার আফজাল হোসেন জানান, মঙ্গলবার গভীর রাতে বাংলাদেশী একদল ব্যবসায়ী ভারত থেকে গরু কিনে দেশে ফিরছিলেন। এ সময় ভারতের আংরাইল সীমান্তের বিএসএফ সদস্যরা তাদের ধাওয়া করে। অন্যরা এ সময় পালিয়ে গেলেও বাতেনকে ধরে বিএসএফ সদস্যরা পিটিয়ে হত্যা করে। পরে তারা তার লাশ নিয়ে যায়। নিহত বাতেন যশোরের শেখহাটি এলাকার খায়রুল বাসারের পুত্র। এ ঘটনায় উভয় সীমান্তে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
দৌলতপুর সীমান্তে কৃষক অপহরণ : কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্ত এলাকা থেকে এক বাংলাদেশী কৃষককে অপহরণ করে নিয়ে গেছে বিএসএফ। বিজিবি সদস্যরা ওই কৃষককে ফেরত পেতে বিএসএফের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
বিজিবি সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল দুপুরে দৌলতপুর উপজেলার ভারত সীমান্ত সংলগ্ন রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর গ্রামের দেরেশ মণ্ডলের ছেলে খবির উদ্দিন (৩১) বাংলাদেশ ভূ-খণ্ডে ঘাস কাটতে ছিল। এ সময় ভারতের মধুগাড়ি ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা তাকে ধরে নিয়ে যায়। তাকে ফেরত পেতে বিজিবি বিএসএফের সঙ্গে আলোচনায় বসে।
এ ব্যাপারে বকমারী ক্যাম্পের নায়েক সুবেদার আ. মালেক জানান, দু’দেশের অমীমাংসিত জমিতে ওই কৃষক ঘাস কাটছিলেন। খুব শিগগিরই এ ব্যাপারে সমঝোতা হবে বলে তিনি জানান। এ ঘটনায় ওই এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বিচার ছাড়া হত্যার দায়মুক্তিকে উত্সাহী করবে : বিএসএফের হত্যায় বিজিবির নিষ্ক্রিয়তা সার্বভৌমত্বকে হুমকিতে ঠেলে দিচ্ছে


স্টাফ রিপোর্টার
সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা, আহত করা ও অপহরণ বিষয়ে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের নিষ্ক্রিয়তা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে বলে দাবি করেছে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার। গতকাল অধিকার অক্টোবর মাসের মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিবেদনে সীমান্ত হত্যা ও অপহরণ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এ মন্তব্য করেছে।
অধিকারের প্রতিবেদনে জানানো হয়, অক্টোবর মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন ৫ নাগরিক, ৮ জন নিহত হয়েছেন গণপিটুনির শিকার হয়ে। সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছেন এক ব্যক্তি। বিএসএফ আরও ৩ বাংলাদেশীকে আহত করেছে এবং ৬ বাংলাদেশীকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। অক্টোবর মাসে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বিষয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের আলোকে এ রিপোর্ট তৈরি করা হয়।
অধিকারের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, অক্টোবর মাসে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ৪৭ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫ জনই হচ্ছে কন্যাশিশু। বাকি ১২ জন হলেন প্রাপ্তবয়স্কা নারী। ৩৫ কন্যাশিশুর মধ্যে আবার ৩ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১১ জন। ধর্ষণের কারণে আত্মগ্লানি সহ্য করতে না পেরে এক কন্যাশিশু আত্মহত্যা করেছে।
যদিও ১৯৯৫ সালে দিনাজপুরে ইয়াসমিন নামে এক নারীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে মানবাধিকার ও নারী সংগঠনগুলো দেশব্যাপী তোলপাড় করেছিল। এখন প্রতিনিয়ত ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ড ঘটছে। কিন্তু নারী সংগঠনগুলো একেবারেই নীরব।
অধিকারের রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, গত মাসে সাতক্ষীরায় তাদের একজন নারী মানবাধিকার কর্মী বখাটেদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছেন। এ বিষয়ে সাতক্ষীরা সদর থানায় একটি মামলাও হয়েছে। রিপোর্টে জানানো হয়, কনকো ফিলিপসের সঙ্গে চুক্তির সত্যায়িত অনুলিপি চেয়ে পেট্রোবাংলাকে বিশিষ্ট ৩ নাগরিকের চিঠির জবাব ২৯ দিনেও পাওয়া যায়নি। তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী বিশিষ্ট ৩ নাগরিক এ চিঠি দিয়েছিলেন। চিঠির জবাব না দেয়ায় অধিকার মানুষের তথ্য জানার অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ধরে নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করেছে। এদের মধ্যে একজন কৃষক, দুইজন নিরীহ সাধারণ মানুষ ও একজন বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক নেতা রয়েছেন। রিপোর্টে বলা হয়, গত ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১১ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘আমি সবসময় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে ছিলাম। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চলছে। এটা রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভব নয়।
প্রধানমন্ত্রীর ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভব নয়’ বক্তব্যটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দায়মুক্তিকেই উত্সাহিত করছে বলে অধিকার মনে করে। বিএসএফ কর্তৃক হত্যাকাণ্ড ও অপহরণের ঘটনায় অধিকার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে এবং বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের সদস্যদের নিষ্ক্রিয়তায় নিন্দা জ্ঞাপন করছে। অধিকার মনে করে, বিএসএফের এ ধরনের আগ্রাসী মনোভাব এবং বিজিবির সদস্যদের নিষ্ক্রিয়তা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জে সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে রাজনৈতিক সহিংসতাসহ বিভিন্ন অনিয়ম বিষয়েও অধিকার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

Monday, 31 October 2011

অধিকার-এর সরেজমিন প্রতিবেদন : রফিকুলকে পাথর ছুড়েই হত্যা করেছে বিএসএফ



স্টাফ রিপোর্টার
সীমান্ত হত্যা বন্ধে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যতই আলোচনা হচ্ছে, ততই বিএসএফ সদস্যরা বাংলাদেশীদের হত্যার কৌশল পরিবর্তন করছে। ভারত সরকার বাংলাদেশকে বারবার সীমান্তে নিরস্ত্র জনগণকে হত্যা না করার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা মোটেও কার্যকর হচ্ছে না। বিএসএফ সদস্যরা এখন সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার কমিয়ে হত্যার কৌশল পরিবর্তন করেছে বলে প্রতীয়মান হয়। কখনও কাঁটাতারের বেড়ায় বিদ্যুত্ সংযোগ করে, কখনও পাথর ছুড়ে নিরস্ত্র বাংলাদেশীদের হত্যা চলছেই।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকার লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক হত্যার শিকার রফিকুলের ঘটনা সরেজমিন তদন্ত করে এ মন্তব্য করেছে। অধিকার সরেজমিন তদন্ত শেষে প্রতিবেদনে বলছে, বিএসএফ নিরস্ত্র বাংলাদেশী রফিকুলকে পাথর ছুড়েই হত্যা করেছে। প্রতিবেদনে অধিকার সীমান্তে মৃত্যুর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে সক্রিয় পদক্ষেপ নিয়ে ভারত সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করতে দাবি জানায়। নিহত রফিকুলের বাড়ি লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম থানার উফারমারা গ্রামে। তার স্ত্রীর নাম মোছাম্মত মিনি বেগম। রিয়াদ হোসেন (৮) ও রিফাত হোসেন (৬) নামে তার দুটি সন্তান রয়েছে। রফিকুল কৃষিকাজের পাশাপাশি বুড়িমারী জিরোপয়েন্টে লেবারের কাজ করতেন।
অধিকার সরেজমিনে গিয়ে নিহতের স্ত্রী মোছাম্মত মিনি বেগম (২৮), ভাই নজরুল ইসলাম (৪৫), চাচাতো ভাই আবেদার রহমান (৪৫), ৮নং বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের আনসার ভিডিপি কমান্ডার এনামুল হক, লাশের সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুতকারী ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পাটগ্রাম থানার এসআই ক্ষীরোদ চন্দ্র বর্মণ, ময়না তদন্তকারী লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. গৌতম কুমার বিশ্বাস, হাসপাতালের মর্গ-সহকারী মোহাম্মদ আলী, বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) ধবলসুতী বিওপি, পাটগ্রামের নায়েব সুবেদার মেজবাহ এবং রফিকুলের লাশের গোসলদানকারীর সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদনটি তৈরি করে।
বিএসএফ সদস্য কর্তৃক পাথর ছুড়ে রফিকুল ইসলামকে হত্যার বিষয়ে পাটগ্রামে সরেজমিনে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে অধিকার জানতে পারে, চলতি বছর ২৪ জুলাই ভোর ৫টায় ভারত থেকে গরু নিয়ে সানিয়াজান নদী পার হওয়ার সময়ে ওই নদীর ভারতীয় অংশে নির্মিত ব্রিজের ওপর থেকে বিএসএফ সদস্যরা তাকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়ে আঘাত করে। এতে তার মাথা ফেটে যায়। পরে ব্রিজের ওপর তুলে আঘাত করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে। বিএসএফের ছোড়া পাথরে দুটি গরুও মারা যায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের আত্মীয়-স্বজনের বরাত দিয়ে অধিকার জানিয়েছে, বিএসএফ শুধু তাকে মেরেই ক্ষান্ত হয়নি, তার লাশ গুম করার লক্ষ্যে নদীতে বাঁশ পুঁতে তাতে বেঁধে রাখে। পরে খবর পেয়ে নিহতের আত্মীয়-স্বজনরা ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে নিয়ে আসে। লাশের সুরতহাল রিপোর্ট ও ময়নাতদন্তে বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। এছাড়া পাথরের আঘাতে তার মাথা ফেটে মগজ বেরিয়ে গিয়েছিল।
রফিকুলের স্ত্রীর বক্তব্য : মোছাম্মত মিনি বেগম অধিকারকে জানান, তার স্বামী একজন ভূমিহীন কৃষক। দুই সন্তান নিয়ে তার অভাবের সংসার। রফিকুল কৃষিকাজের অবসরে সীমান্তের বুড়িমারীর জিরো পয়েন্টে লেবারের কাজ করতেন। চলতি বছর ২৩ জুলাই ৫টায় তার স্বামী বাজার করতে বুড়িমারীবাজারে যান। রফিকুল রাতে আর বাসায় না ফেরায় তিনি তার চাচাতো ভাশুর মো. আবেদার রহমানকে বিষয়টি জানান। আবেদার রহমান তাকে বলেন, রফিকুল গরু আনতে যেতে পারে। ২৪ জুলাই ভোরে তিনি মোবাইল ফোনে রফিকুলের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে আবারও আবেদার রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আবেদার রহমান তাকে জানান, ভোরের দিকে তিনি বুড়িমারী বাজারে গিয়ে গরু ব্যবসায়ীদের কাছে শুনেছেন, রাতে অনেকেই ভারত থেকে গরু নিয়ে ফিরলেও রফিকুল ফেরেনি। এছাড়া বাজারে অনেককেই বলাবলি করতে শোনেন, বিএসএফ সদস্যরা রাতে নদী পারাপারকারীদের পাথর ছুড়ে আঘাত করেছে। রফিকুলকেও পাথর ছোড়া হয়েছিল বলে বাজারের অনেকেই আলোচনা করছিলেন।
তারপর আবেদার রহমান রফিকুলের ভাই নজরুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্তের বামনদল গ্রামে সানিয়াজান নদীর তীরে যান এবং নদী থেকে রফিকুলের লাশ উদ্ধার করে সকাল সাড়ে ৯টায় বাড়ি আনেন। লাশ বাড়ি আনার পরে পাটগ্রাম থানার পুলিশ সদস্যরা লাশ নিয়ে যায়। লাশের ময়নাতদন্ত শেষে ২৫ জুলাই বিকাল সাড়ে ৪টায় লাশ বাসায় নিয়ে আসার পর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। লাশের কপালে একটি ক্ষত ছিল, মাথার মগজ বেরিয়ে গিয়েছিল, নাক, মুখ ও কান দিয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছিল।
এসআই, পাটগ্রাম থানা : এসআই ক্ষীরোদ চন্দ্র বর্মণ অধিকারকে বলেন, ২৪ জুলাই দুপুর সোয়া ২টায় উফরমারা গ্রামের নজরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি থানায় আসেন এবং বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন (নম্বর-২১, তারিখ-২৪.৭.২০১১; ধারা-৩০২/২০১/৩৪ দণ্ডবিধি)। তিনি নিজেই মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা। তিনি বিকাল ৩টায় রফিকুলের বাড়ি যান এবং লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। পরে পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য লাশ লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে পাঠায়। ২৫ জুলাই ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে রফিকুলের লাশ হস্তান্তর করা হয়।
ডা. গৌতম কুমার বিশ্বাস : লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. গৌতম কুমার বিশ্বাস অধিকারকে বলেন, ২৪ জুলাই সন্ধ্যা ৭টায় পাটগ্রাম থানার পুলিশ সদস্যরা রফিকুল নামে এক ব্যক্তির লাশ হাসপাতালে আনেন। তিনি জানতে পারেন, বিএসএফ সদস্যদের পাথরের আঘাতে রফিকুল মারা গেছেন। ২৫ জুলাই সকাল আনুমানিক ১০টায় ডা. মোতাছিব, ডা. মেহেদী মাসুম ও তাকে নিয়ে গঠিত তিন সদস্যের বোর্ড লাশের ময়নাতদন্ত করেন। তিনি জানান, পাথর বা শক্ত কিছু দিয়ে কপালে আঘাত করায় করোটির হার ফেটে গিয়েছিল, যার ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েই রফিকুলের মৃত্যু হয়েছে।

Saturday, 1 October 2011

ফুলবাড়ী সীমান্ত থেকে ২ বাংলাদেশীকে ধরে নিয়ে গেছে বিএসএফ

ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বিদ্যাবাগিশ সীমান্ত থেকে দুই বাংলাদেশী যুবককে বিএসএফ ধরে নিয়ে গেছে। মারধর শেষে গতকাল সকালে ওই দুই যুবককে বিএসএফ জেলহাজতে পাঠিয়েছে। বিজিবি তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে, গত ২৮ সেপ্টেম্বর বুধবার বিকালে উপজেলার বিদ্যাবাগিশ ঠোস সীমান্তের আন্তর্জাতিক পিলার ৯৩৯ এর পাশের ভারতীয় অভ্যন্তরে নগরকুরষা সীমান্তে।
বিজিবি ও দুই যুবকের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার সীমান্তবর্তী বিদ্যাবাগিশ ঠোস গ্রামের কৃষক মোজাহার আলীর ছেলে মজিদুল ইসলাম ও নজির হোসেনের ছেলে হুজুর আলী নামের দুই যুবক বুধবার তাদের বাড়ি থেকে পার্শ্ববর্তী ভারতীয় নগরকুরষা সীমান্তের আত্মীয় জয়নাল পাগলার বাড়িতে দাওয়াত খেতে যায়। জয়নাল পাগলা আটককৃত যুবক হুজুর আলীর আপন চাচা। ওই বাড়িতে বিকাল ৪টায় তারা ভাত খেতে বসে। কোচবিহার জেলার দিনহাটা থানার কুরষাহাট
ক্যাম্পের বিএসএফ তাদের ভাত খাওয়া অবস্থায় ধরে নিয়ে যায়। বিএসএফ সদস্যরা দুই যুবককে ক্যাম্পে নিয়ে মারধর করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশী দুই যুবককে ফেরত আনার ব্যাপারে কুড়িগ্রাম ৪৫ বিজিবির ফুলবাড়ী গঙ্গারহাট বিওপির নায়েব সুবেদার নিশিকান্ত ও হাবিলদার আইয়ুব আলী জানান, তারা দুই যুবককে ফেরত পেতে পদক্ষেপ নেয়ার আগেই বিএসএফ তাদের জেলহাজতে পাঠিয়েছে। তবে ধরে নিয়ে যাওয়ার কারণ জানতে তারা বিএসএফকে পত্র দেবেন।

Saturday, 24 September 2011

সীমান্ত হত্যাকাণ্ড নিয়ে অধিকারের কেসস্টাডি : কারণ ছাড়াই বিএসএফ গুলি করে মেরেছে সিলেটের আশরাফুলকে



স্টাফ রিপোর্টার

সীমান্তে ভারতীয় নিরাপত্তা রক্ষী (বিএসএফ) গুলি চালিয়ে নিরপরাধ বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ডের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে অধিকার’র অনুসন্ধানে। সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী কালিডর ধলাই নদী এলাকায় পাথরের কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে বিএসএফ’র গুলিতে প্রাণ হারায় আশরাফুল। আশরাফুলকে নির্দয়ভাবে হত্যা করার ঘটনাটি বেসরকারি সংস্থা অধিকার কেসস্টাডি হিসেবে গ্রহণ করে অনুসন্ধান চালায়।
অধিকারের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১ জুলাই রাত ৯টায় একই উপজেলার বাঘারপাড় গ্রামের মো. আবদুুল আহাদ ও লালবানুর ছেলে আশরাফুল ইসলাম (২০), একই গ্রামের মৃত কনু মিয়া ও হাওয়াতুন নেছার ছেলে সোনা মিয়া (১৯) এবং পারুয়া নোয়াগাঁও গ্রামের আফতাব আলী ও আমিরুন নেছার ছেলে এলাইছ মিয়া (২২) পাথর আনতে সীমান্ত এলাকায় ধলাই নদীর বাংলাদেশ অংশে কালিডর পাথর কোয়ারিতে যায়। ভারতের শিলং অঞ্চলের ভোলাগঞ্জ থানার কালিডর ক্যাম্পের ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে আশরাফুল ও এলাইছ গুলিবিদ্ধ হয়। আশরাফুল ও এলাইছের পরিবার গুলিবিদ্ধ দুজনকে হাসপাতালে নেয়ার পথে আশরাফুল মারা যায় এবং এলাইছ মিয়াকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে।
সেখানে ৮ দিন চিকিত্সার পর বাড়িতে আনা হয়।
আবদুুল আহাদ অধিকার-কে জানান, তার ছেলে আশরাফুল ইসলাম তাকে কৃষিকাজে সহযোগিতা করত। ঘটনার কয়েক দিন আগে পশ্চিম ইসলাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ‘বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় টুর্নামেন্ট’-এ চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় আশরাফুল খেলোয়াড়দের পুরস্কার দিতে চেয়েছিল। এ পরিপ্রেক্ষিতে আশরাফুল তার বন্ধু এলাইছ মিয়া ও সোনামিয়াকে নিয়ে নদী থেকে পাথর সংগ্রহ ও বিক্রি করে পুরস্কার কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। পরিকল্পনামতো ১ জুলাই আনুমানিক রাত ৮টায় আশরাফুল দু’বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হয়। রাত ৯টায় নৌকাযোগে ধলাই নদীর কালিডর পাথর কোয়ারিতে পৌঁছে। সেখানে আরও প্রায় এক-দেড়শ’ শ্রমিক পাথর তোলার জন্য গিয়েছিল। রাত আনুমানিক ৯টা ৫ মিনিটে সোনামিয়া আশরাফুলের বাবাকে মোবাইল ফোনে জানায়, তার ছেলে ও এলাইছ পাথর তোলার জন্য নদীতে গেলে ভারতের বিএসএফ সদস্যরা তাদের দিকে গুলি ছোড়ে। বিএসএফ’র ছোড়া গুলি বাংলাদেশের ২শ’ গজ ভেতরে থাকা আশরাফুল ও এলাইছের শরীরে বিদ্ধ হয়। সোনামিয়া মোবাইল ফোনে তাকে আরও জানায়, গুলিবিদ্ধ দুজনকে কোম্পানীগঞ্জ থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের অবস্থার অবনতি হওয়ায় রাত আনুমানিক ১০টায় সোনামিয়া কোম্পানীগঞ্জ থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে তাদের উন্নত চিকিত্সার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়।
রাত সাড়ে ১১টায় চিকিত্সক আশরাফুলকে মৃত ঘোষণা করেন। আবদুুল আহাদ আরও জানান, পরদিন, ২ জুলাই আশরাফুলের লাশের ময়নাতদন্ত শেষে বিকাল সাড়ে ৫টায় হাসপাতাল থেকে লাশ নিয়ে রওনা দিয়ে বাসায় পৌঁছে রাত সাড়ে ৯টায়। এর পর তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। তিনি আরও জানান, আশরাফুলের মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত ৩৩টি ছররা গুলি লেগেছিল বলে ময়নাতদন্তকারী ডাক্তারের কাছ থেকে জেনেছেন। তার অপর ছেলে নজরুল ইসলাম ২ জুলাই কোম্পানীগঞ্জ থানায় গিয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে।
এলাইছ মিয়া অধিকার-কে জানায়, ১ জুলাই সে তার বন্ধু আশরাফুল ও সোনামিয়াকে সঙ্গে নিয়ে পাথর তোলার জন্য নৌকায় করে সীমান্ত এলাকার কালিডরে যান। সেখানে তখন প্রায় এক-দেড়শ’ শ্রমিক পাথর তুলছিল। এ সময় রাতের অন্ধকারে ভারত সীমান্ত থেকে বিএসএফ সদস্যরা তাদের দিকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের কেউ পানিতেই বসে পড়ে আবার অনেকে ডাঙায় শুয়ে পড়ে। বিএসএফ সদস্যদের গুলি এসে তার এবং আশরাফুলের শরীরে লাগে। সে জানায়, সেগুলো ছররা গুলি হওয়ায় শরীরের বিভিন্ন স্থানে তা বিদ্ধ হয়। গুলি ছোড়া বন্ধ করে বিএসএফ সদস্যরা চলে গেলে উপস্থিত শ্রমিকদের সহায়তায় সোনামিয়া তাকে ও আশরাফুলকে চিকিত্সার জন্য কোম্পানীগঞ্জ থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিত্সার পর তাদের অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় দুজনকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে ডাক্তার আশরাফুলকে মৃত ঘোষণা করেন এবং সে নিজে ওই হাসপাতালের চতুর্থ তলার ৪নম্বর ওয়ার্ডে ৮দিন চিকিত্সা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। তার শরীরে ২৫-২৬টি ছররা গুলি লেগেছিল। সে শুনেছে, আশরাফুলের মাথায় ও বুকের নিচে গুলিবিদ্ধ হওয়ায় প্রচুর রক্তক্ষরণে সে মারা যায়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সোনামিয়া অধিকার-কে বলে, আশরাফুল ও এলাইছের সঙ্গে ১ জুলাই পাথর তোলার জন্য কালিডর এলাকায় যায়। তারা বাংলাদেশের ২শ’ গজ ভেতরে পাথর তোলার জন্য গেলে রাতের অন্ধকারে বিএসএফ সদস্যরা তাদের দিকে গুলি ছোড়ে। এতে আশরাফুল ও এলাইছ গুলিবিদ্ধ হয়। সে তখন মোবাইল ফোনে এলাইছ এবং আশরাফুলের বাড়িতে তাদের আহত হওয়ার খবর জানায়। সে ও শ্রমিকরা গুলিবিদ্ধ দুজনকে প্রথমে কোম্পানীগঞ্জ থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। কর্তব্যরত ডাক্তার প্রাথমিক চিকিত্সার পর তাদের অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে বলেন। তখন সে তাদের সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার আশরাফুলকে মৃত ঘোষণা করেন।
থানা স্বাস্থ্য কর্মকর্ত ডা. আবদুুল্লাহ অধিকার-কে বলেন, কয়েকজন লোক ১ জুলাই রাত ১০টায় কালিডর থেকে গুলিবিদ্ধ আশরাফুল ও এলাইছ মিয়া নামে দুজনকে নিয়ে থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসে। তিনি দুজনকে প্রাথমিক চিকিত্সা দেন। তবে তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তিনি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাদের নিতে বলেন।
কোম্পানীগঞ্জ থানা পুলিশ পরির্দশক কামাল আহমদ অধিকার-কে বলেন, ২ জুলাই রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে বাঘারপাড় গ্রামের নজরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি থানায় এসে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। মামলার এজাহারে নজরুল ইসলাম উল্লেখ করে, তার ছোট ভাই আশরাফুল ইসলাম ১ জুলাই বন্ধু এলাইছ মিয়া ও সোনামিয়াকে নিয়ে পাথর আনতে সীমান্ত এলাকার ধলাই নদীর বাংলাদেশ অংশে কালিডর পাথর কোয়ারিতে যায়। অজ্ঞাতনামা বিএসএফ সদস্যরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে তার ভাই আশরাফুল মারা যায়।
পুলিশ পরিদর্শক কামাল আহমদ এর পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের কিছু অংশ নদীতে ভেঙে গেছে। সেখানে বাংলাদেশের শ্রমিকরা পাথর তুলতে গেলে বিএসএফ সদস্যরা প্রায়ই বেআইনিভাবে গুলি ছোড়ে। এতে প্রায়ই মানুষ মারা যায়। এসব বিষয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরাও জানেন।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ’র সুবেদার চান মিয়া অধিকার-কে বলেন, ১ জুলাই এ ঘটনার কথা তিনি শুনেছেন। তবে এ ব্যাপারে তিনি কিছু বলতে অপারগ। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ সহকারী মাসুক আহমদ অধিকার-কে বলেন, ১ জুলাই রাত আনুমানিক ১১টা ৪৫মিনিটে কোম্পানীগঞ্জ থানার পুলিশ সদস্যরা আশরাফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে আনেন। ২ জুলাই দুপুরের দিকে লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। লাশের বিভিন্ন অংশে ছররা গুলি লেগেছিল। তাছাড়া লাশের শরীর থেকে বেশ কিছু গুলি বের করে পুলিশকে আলামত হিসেবে দিয়ে দেয়া হয়। আশরাফুলের লাশের গোসলদানকারী আবদুুল বারী অধিকার-কে বলেন, তিনি আজিজুল হক ও আতাউর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে আশরাফুলের লাশের গোসল দিয়েছেন। লাশের মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত অনেক ছররা গুলির চিহ্ন দেখেছেন বলে জানান। এছাড়া প্রচুর রক্তক্ষরণেরও চিহ্ন ছিল।
সীমান্ত হত্যাকাণ্ড নিয়ে অধিকার’র মন্তব্যে বলা হয়েছে, ভারতীয় বিএসএফ’র গুলিতে সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যার ঘটনা অবিরত ঘটেই চলেছে। গত ১২ মার্চ ভারতের নয়াদিল্লিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ও বিএসএফ’র মধ্যে ৫দিনের বৈঠকের শেষ দিনে বিএসএফ’র মহাপরিচালক রমন শ্রীবাস্তব জানান, বাংলাদেশ সীমান্তে ভারত আর প্রাণঘাতী অস্ত্র চালাবে না; তবুও সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার করে ভারত নিরস্ত্র বাংলাদেশীদের নির্বিচারে হত্যা করছে

ভারতে দলিতদের চেয়ে মুসলমানদের অবস্থা খারাপ


স্টাফ রিপোর্টার
ভারতে নিম্নবর্ণের হিন্দু দলিতদের চেয়ে মুসলমানদের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। কিছুসংখ্যক মুসলমানের অবস্থার উন্নতি হলেও এ চিত্র ভারতীয় আর্থসামাজিক অবস্থার অসামঞ্জস্যেরই ইঙ্গিত বহন করে। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে টিকে থাকতে এবং বহিঃশক্তির প্রভাবে মুসলমানরা বহুধাবিভক্ত হয়েছে। আর এই বিভক্তি তাদের জন্য অনেকটাই অপমানের।
নয়াদিল্লির মার্কিন দূতাবাসের এক তারবার্তা প্রকাশ করে এমন খবর দিয়েছে সাড়াজাগানো ওয়েবসাইট উইকিলিকস। গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ‘ইউএস ভিউজ অন ইন্ডিয়ান ইসলাম অ্যান্ড ইটস ইন্টারপ্রেটেশন’ শিরোনামে দিল্লি থেকে ওয়াশিংটনে পাঠানো ওই তারবার্তাটি প্রকাশ করেছে উইকিলিকস।
এছাড়া তারবার্তাটিতে ভারতীয় মুসলমানদের শিয়া-সুন্নির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বেরেলভি ও দেওবন্দির গ্রুপের মতো পার্থক্যের কথা বলা হয়েছে।
তারবার্তায় বলা হয়েছে, ভারতে অন্তত ১৮ কোটি মুসলমান রয়েছে, যা ভারতের আদমশুমারিতে অনেক কম দেখানো হয়েছে। ভারতীয় অনেক সূত্রের বরাত দিয়ে তারবার্তাটিতে বলা হয়েছে, সরকারি হিসাব (আদমশুমারি ২০০১) অনুযায়ী ভারতে মুসলমানের সংখ্যা ১৩ কোটি ৮০ লাখ। কিন্তু আমেরিকা মনে করে, ভারতে মুসলমানের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। নয়াদিল্লির মার্কিন দূতাবাসের মতে, সংখ্যাটি ১৬ থেকে ১৮ কোটি।
তারবার্তায় ভারতীয় মুসলমানদের উদারপন্থি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়েছে, আজিম প্রেমজির মতো কোটিপতি থাকলেও ভারতে বেশিরভাগ মুসলমানের অবস্থা খুবই খারাপ। তারবার্তায় মন্তব্য করা হয়, কোটিপতি মুসলিম ভারতীয়রা দেশটির অর্থনীতিতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বলিউড অভিনেতা শাহরুখ খানের মতো আইকনদের অসংখ্য ভক্ত রয়েছে ভারতে। তবে সেখানকার মুসলমানরা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। তারবার্তায় বলা হয়, ভারতের পার্লামেন্ট বা অন্যান্য নির্বাচনী বডিতে মুসলমানদের সংখ্যা খুবই নগণ্য।

Tuesday, 16 August 2011

সিলেট সীমান্তে বিএসএফ ও খাসিয়াদের গুলিতে নিহত ২











দেলোয়ার হোসেন জৈন্তাপুর (সিলেট)
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার বিছনাকান্দি সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফ এবং খাসিয়া নাগরিকদের যৌথ আক্রমণে গুলিতে দুই বাংলাদেশী পাথর শ্রমিক নিহত ও একজন আহত হয়েছেন। এলোপাতাড়ি গুলিতে ঘটনাস্থলেই তারা নিহত হন। গতকাল ভোররাতে বিছনাকান্দি পাথর কোয়ারিতে ১২৬৩ নম্বর সীমান্ত পিলারের কাছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এ ঘটনা ঘটে। ভারতীয়রা তাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গুলি করে হত্যা করে। এনিয়ে সীমান্ত এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি-চিদাম্বরম গত ৩০ জুলাই বাংলাদেশ সফরকালে ওয়াদা করেছিলেন সীমান্তে আর কোনো বাংলাদেশীকে গুলি করে হত্যা করা হবে না। তার এ প্রতিশ্রুতির মাত্র ১১ দিনের মাথায় গুলি করে বাংলাদেশী জোড়া খুন করল ভারত। এর আগে গত ২৩ জুলাই
ভারতীয় কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী বাংলাদেশ সফরের দিনও সীমান্তে বাংলাদেশী খুন করেছিল ভারত।
সিলেটের গোয়াইনঘাট সীমান্তে ভারতীয়দের গুলিতে গতকাল নিহতরা হলেন, বিছনাকান্দি গ্রামের নাছির উদ্দিনের ছেলে কামাল উদ্দিন জহুর (৩২) ও ইরফান আলীর ছেলে কামাল আহমদ (৩০)। আহত হয়েছেন একই গ্রামের সারং উদ্দিনের ছেলে ইমাম উদ্দিন। গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ এ ঘটনার সত্যতা স্বীকারে করে বলেছেন, পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যরা লাশ দুটি উদ্ধার করেছে। ময়নাতদন্তের জন্য উপজেলা প্রশাসন লাশ সিলেটে ওসমানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে চাইলে আত্মীয় ও এলাকাবাসী আপত্তি জানায়। পরবর্তীতে প্রশাসনের সম্মতিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
ঘটনাস্থল থেকে বেঁচে আসা এক শ্রমিক জানান, শুক্রবার ভোর সাড়ে ৪টায় বিছনাকান্দি পাথর কোয়ারির বগাইয়া নদীতে ১২৬৩ নম্বর সীমান্ত পিলারের কাছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাথর উত্তোলন করতে যায় তিন শ্রমিক। এ সময় বিএসএফ ও ভারতীয় খাসিয়ারা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে ঘটনাস্থলেই দু’জন বাংলাদেশী শ্রমিক মারা যায়। একজন পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। পালিয়ে আসা আহত শ্রমিক গ্রামবাসীদের ঘটনা জানালে লাশের সন্ধানে গ্রামের মানুষ ঘটনাস্থলে যায়। তারা লাশের সন্ধান করতে থাকে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর ভোর ৬টায় একজন এবং সকাল ৯টায় আরও একজনের লাশের সন্ধান পান তারা। পরে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সিলেট সেক্টরের অধিনায়ক লে. কর্নেল শফিউল আজম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, সন্ধ্যার পর কোয়ারি এলাকায় পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ থাকলেও এসব শ্রমিক রাতের আঁধারে সেখানে গিয়েছিল। তিনি জানান, বিজিবি এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং বিএসএফ’র সঙ্গে বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। গত সন্ধ্যায় বিএসএফ ও বিজিবির মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানা গেছে। গোয়াইনঘাট থানার ওসি ইউনুছ মিয়া জানান, ভোর সাড়ে ৪টায় ১২৬৩ সীমানা পিলারের কাছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কোয়ারি এলাকার বগাই নদীতে নৌকাযোগে পাথর উত্তোলন করতে যান কয়েকজন বাংলাদেশী। এ সময় ভারতীয়রা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। ওসি আরও জানান, আত্মীয় ও এলাকাবাসীর দাবির কারণে ময়নাতদন্ত ছাড়াই কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষ লাশ হস্তান্তর করা হয়। বিকাল ৫টায় বিছনাকান্দি জামে মসজিদ মাঠে জানাজা শেষে গ্রামের কবরস্থানে লাশ দাফন করা হয়।
এদিকে ভারতীয় বিএসএফ’র গুলিতে বাংলাদেশী শ্রমিক নিহত হওয়ায় প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছেন সিলেট ৪-আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি দিলদার হোসেন সেলিম। তিনি বলেন, বিএসএফ’র গুলিতে পাথর শ্রমিক নিহত হওয়া আবারও ভারত জাতীয় বেইমানির পরিচয় দিল। মাত্র এক সপ্তাহ আগে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি-চিদাম্বরম বাংলাদেশ সফরে এসে বলেছিলেন সীমান্তের লোকজনের ওপর আর কোনো গুলি চালাবে না ভারত, এতে প্রমাণ হয় ভারত তার দৃষ্টিভঙ্গি বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করেনি।
এ ব্যাপারে গেয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম চৌধুরী জানান, তিনি ঘটনার সংবাদ শুনে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলাপ আলোচনা করেন এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, আমি ঘটনার খবর পেয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করেছি, নিহতের পরিবার ময়নাতদন্ত ছাড়া দাফনের জন্য আবেদন জানালে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে লাশ দাফনের সুযোগ দিয়েছি।
ইলিয়াস আলীর প্রতিবাদ : বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক, সিলেট জেলা বিএনিপর সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলী এক বিবৃতিতে সিলেটের গোয়াইনঘাটে বিছনাকান্দি সীমান্তে ভারতীয়দের গুলিতে দু’জন নিরীহ বাংলাদেশী নিহত হওয়ায় তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বর্তমান শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে একের পর এক হামলা চালিয়ে নিরীহ বাংলাদেশীদের অব্যাহতভাবে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করছে। ভারতের সেবাদাস এ সরকার এসব হত্যাকাণ্ড ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে হামলা এবং জমি দখলের প্রচেষ্টার ন্যূনতম কোনো প্রতিবাদ করছে না। সীমান্তে যৌথ জরিপের নামে একতরফাভাবে বাংলাদেশের জনগণের বসতভিটা ভারতীয়দের হাতে তুলে দেয়ার চক্রান্ত করছে। এরই মধ্যে সরকার পাদুয়া, বিবির হাওড় ও বিছনাকান্দিসহ সীমান্তে একতরফা জরিপ করে যাচ্ছে। সরকার ভারতীয়দের নীল নকশানুযায়ী সীমান্তে জরিপ চালাচ্ছে। তিনি বলেন, তাঁবেদার শেখ হাসিনা সরকার একদিকে বাংলাদেশের ভূমি প্রহসনের জরিপের মাধ্যমে ভারতীয়দের হাতে তুলে দিচ্ছে। অপরদিকে ভারতীয়রা সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশীদের হত্যা করছে। সরকারের ব্যর্থ পররাষ্ট্রনীতির কারণে বাংলাদেশের প্রতিটি সীমান্ত আজ অরক্ষিত। বর্তমান শেখ হাসিনা সরকার ভারতের কাছে বাংলাদেশের জনগণকে জিম্মি করে ফেলেছে।
http://www.amardeshonline.com/pages/details/2011/08/13/98971

Friday, 5 August 2011

সৌদি আরব থেকে ফেরত আসছে ১০ লাখ বাংলাদেশী : বাংলাদেশবিরোধী অপপ্রচার ভারতের

সৈয়দ মিজানুর রহমান সৌদি আরব থেকে
আকামা (ওয়ার্কপারমিট) পরিবর্তন জটিলতার কারণে সৌদি আরব থেকে প্রায় ১০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশীকে ছয় মাসের মধ্যে দেশে ফিরে যেতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ হয়ে যাওয়ায় এসব বাংলাদেশীর জেল-জরিমানা ও পুলিশি নির্যাতন শুরু হয়েছে।
সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, দেশটিতে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত অর্ধেক প্রবাসী বাংলাদেশীই এখন অবৈধ। কারণ গত প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে বাংলাদেশীদের ওয়ার্কপারমিট নবায়ন বন্ধ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেড় বছর আগে সৌদি আরব সফরকালে সৌদি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর আকামা পরিবর্তন ও নবায়ন জটিলতা দূর হওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। গত মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দিপু মনি সৌদি আরব সফর করে এ বিষয়ে তেমন কোনো উলেল্গখযোগ্য সাড়া পাননি বলে জানা গেছে। তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের এ সংক্রান্ত সব প্রশ্ন এড়িয়ে যান বলেও জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতির সভাপতি রুমি সাঈদ জানান।
জানা গেছে, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার সময় সৌদি আরবের ছোট-বড় বহু কোম্পানি বন্ধ হয়ে যায়। এতে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাংলাদেশীরা বেকার হয়ে পড়ে। তবে বছরখানেকের মধ্যেই সৌদি আরব অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে ওঠে এবং বহু নতুন কোম্পানি চালু হয়। বেকার এসব বাংলাদেশী ওইসব কোম্পানিতে চাকরি নেয়। কিন্তু জটিলতা দেখা দেয় আকামা পরিবর্তন নিয়ে।
সৌদি সরকার গত সাড়ে চার বছর ধরে বাংলাদেশীদের আকামা পরিবর্তন ও নবায়ন পুরোপুরি বন্ধ রাখায় নতুন নিয়োগকর্তাদের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এসব বাংলাদেশীকে বৈধ করতে পারছেন না। অন্যদিকে কিছু সৌদি স্পন্সর ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে বহু বাংলাদেশী প্রবাসীকে সৌদি আরবে আকামা দেয়। কিন্তু সৌদি কর্তৃপক্ষ এ ধরনের কাগজসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নবায়ন বন্ধ করে দেয়। যার ফলে তাদের অধীনে আসা বাংলাদেশীরা পড়ে বিপাকে।
কথা হয় আভায় কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিক হাসান মাহমুদের সঙ্গে। তিনি জানান, গত দেড় বছর ধরে তিনি একটি কোম্পানিতে কাজ করছেন ঠিকই, কিন্তু তার আকামা পরিবর্তন হয়নি। কথা ছিল এ বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফিরে বিয়ে করবেন। কিন্তু আকামা না হওয়ায় তার দেশে ফেরা বা এখানে থাকা দুটিই অনিশ্চিত। যে কোনো মুহূর্তে সৌদি পুলিশ অবৈধ অবস্থানের অভিযোগে তাকে জেল-জরিমানাসহ দেশে ফেরত পাঠাতে পারে।
রিয়াদের একটি শ্রমিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী বাংলাদেশী নাগরিক কবির হোসেন জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সৌদি আরবের বিভিন্ন কেম্প্পানিতে নিয়োজিত প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশী এখন অবৈধ। আকামা বদল না হওয়ায় এদের আগামী ছয় মাসের মধ্যে দেশে ফিরে যেতে হবে। অথচ এদের অনেকেরই এখন পর্যন্ত সৌদি আরবে আসার খরচই ওঠেনি। এদের অধিকাংশই গ্রামের ভিটেমাটি বিক্রি করে ভাগ্য বদলের আশায় এখানে এসেছিলেন।
মদিনায় গত এক বছর ধরে অবৈধভাবে কাজ করছেন বঙ্গবন্ধু পরিষদ মদিনা শাখার সভাপতি ইদ্রিস আলী। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা আমাদের এ চরম ভোগান্তির কারণ। তিনি জানান, তার মতো আরও লাখ লাখ বাংলাদেশী চরম অনিশ্চয়তা ও শঙ্কার মধ্যে এখানে দিন কাটাচ্ছেন।
জানা গেছে, বিদেশিদের জন্য সৌদি আরবে আকামার মেয়াদ থাকে ৩ থেকে ৫ বছর। এর মধ্যেই আকামা নবায়ন বা পরিবর্তনের সুযোগ আছে। তবে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইনসহ অন্য সব দেশের জন্যই আকামা নবায়ন বা পরিবর্তনের দরজা খোলা রয়েছে। ওইসব দেশের নাগরিকদের কোনো ভোগান্তিও নেই। কিন্তু ২০০৭ সালে হঠাত্ করেই বাংলাদেশী নাগরিকদের কাজের জন্য নতুন ভিসা, আকামা নবায়ন ও পরিবর্তন বন্ধ করে দেয় সৌদি কর্তৃপক্ষ। এরপর আশ্বাস পাওয়া গেছে চালুর। কিন্তু চরম কূটনৈতিক ব্যর্থতার কারণে তা আর হচ্ছে না।
বর্তমানে জেদ্দায় অবস্থানরত গেল্গাবাল ইকোনমিস্ট ফোরামের সভাপতি এনায়েত করিম অভিযোগ করেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার দেশের ভাব-মর্যাদা উন্নয়নে কোনো রকম উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশবিরোধী অপপ্রচার। তিনি আরও জানান, সৌদি আরবে ভারতের একটি নিজস্ব পত্রিকা রয়েছে। তাছাড়া ভারতের প্রায় সবক’টি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা সৌদি আরবের স্টলে পাওয়া যাচ্ছে। এতে অতি সহজেই ভারত তাদের নিজেদের ইমেজ তৈরি এবং বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণায় এগিয়ে যাচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে সৌদি আরবে বাংলাদেশের বিশাল শ্রমবাজার দখল করা। আর এতে বাড়তি সুযোগ পাচ্ছে ভারতীয় শ্রমিকরা।

Saturday, 9 July 2011

ফরেন পলিসি' ম্যাগাজিনের রিপোর্ট ভারত-দুর্গের জন্য বাংলাদেশ ঘিরে দিল্লীর বার্লিন প্রাচীর

শাহেদ মতিউর রহমান : বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত এখন ক্রমেই বিশ্বের অন্যতম রক্তঝরা একটি সীমান্তাঞ্চলে পরিণত হচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সীমান্তবিষয়ক জটিলতার সংবাদ শিরোনাম হলেও সাম্প্রতিক সময়ের বেশ কিছু ঘটনা প্রবাহ এবং বাংলাদেশ ও ভারতের এই সীমান্তের হত্যাকান্ড নিয়ে বেশ উদ্বেগেরও সৃষ্টি করেছে। সূত্রে প্রকাশ গত এক দশকে দু'দেশের এক হাজার ৭৯০ মাইল দীর্ঘ এই সীমান্ত ঘিরে প্রায় এক হাজার নিরপরাধ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। ভারত তার ২৫ সালা সীমান্ত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ১২০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজটিও প্রায় সম্পন্ন করেছে। আগামী বছরের মধেই এর পুরো কাজটি তারা শেষ করতে চাইছে। তবে এত বড় একটি সীমানা ঘিরে ভারতের বেড়া নির্মাণের পরেও সীমান্তের এই হত্যাকান্ডের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছে। অনেকে আজ প্রশ্ন তুলেছেন তাহলে কী ভারত-দুর্গের জন্য বাংলাদেশ ঘিরে দিল্লীর কোন বার্লিন প্রাচীর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী ফরেন পলিসি তাদের ২০১১ এর জুলাই-আগস্ট সংখ্যায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে নির্বিচারে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ হত্যা ও নির্যাতনের ওপরে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। স্কট কার্নি, জ্যাসন মিকলেইন ও ক্রিসটেইন হোলসারের সেই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ফেলানী হত্যাকান্ড থেকে শুরু করে তুলে ধরা হয়েছে গত এক দশকের সীমান্ত হত্যার লোমহর্ষক নানা কাহিনী।
ম্যাগাজিনের ঐ রিপোর্টে বলা হয়েছে সীমান্তে বেড়া নির্মাণকে ভারতীয়রা তাদের জন্য একটি সর্বরোগ হরণকারী প্রতিষেধক হিসেবে বিবেচনা করছে। তাদের বিবেচনায় এই বেড়া নির্মাণের ফলে মুসলিম জঙ্গিবাদ ও কাজের সন্ধানে বেআইনিভাবে ভারতে প্রবেশকারী বিদেশীদের আটকানো সহজ হবে। কিন্তু তার পরেও সীমান্তে যেভাবে হত্যাকান্ড চলছে তা বিশ্ব বিবেকের দরজায় আজ কড়া নাড়ছে।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে ভারতের এই নির্বিচার হত্যাকান্ড বন্ধ করতে ভারতের উচ্চ পর্যায়ে বার বার আবেদন নিবেদন জানানোর পরেও কিন্তু এই হত্যাকান্ড বন্ধ হচ্ছে না। তবে তারা অনেক সময়েই আমাদেরকে এই বলে ওয়াদা দিয়েছে ও আশ্বস্ত করেছে যে তারা আর কোন হত্যাকান্ড ঘটাবে না কিংবা সীমান্তে তারা কোন ভারী অস্ত্রও আর ব্যবহার করবে না। কিন্তু কখনোই তারা বাস্তবে তাদের সেই কথা কিন্তু রাখেনি।
উপরন্তু ভারতের কর্তা ব্যক্তিরা বাংলাদেশীদের বিভিন্নভাবে অপরাধী সাজিয়ে এই হত্যাকান্ড অব্যাহত রেখেছে। এদিকে ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম' এর প্রধান কর্মকর্তা কিরিটি রায় বলেছেন সাধারণত সীমান্তের লাইন ম্যানের সাথে অর্থ লেনদেন ছাড়া কেউই বেড়া পারাপারের জন্য ঝুঁকি নেন না। তারা বিএসএফকে ঘুষ দিয়ে অন্যমনস্ক করে অবৈধ অভিভাসীদের সীমান্ত পারাপারে সহায়তার এই কাজটি করে থাকে। ভারতের এই মানবাধিকার সংগঠনটি গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশের অধিকার ও হিউম্যান রাইটস এর সাথে যৌথ উদ্যোগে সীমান্ত হত্যাকান্ড ও সমসাময়িক বিষয়ে একটি জরিপ কাজ পরিচালনা করে তাদের গবেষণা প্রতিবেদনও প্রকাশ করে। ঐ প্রতিবেদনে মাসুম এর প্রধান কিরিটি বলেন, সীমান্তে ঘুষ প্রথার কারণেই সেখানে এই হত্যাকান্ড বেশি ঘটে। ঘুষ না দিয়ে যদি কেউ সীমান্ত পার হতে চেষ্টা করে তাহলে লাইনম্যানরা বিষয়টি অস্ত্রধারী বিএসএফকে জানিয়ে দেয় এবং গুলী চালাতে উৎসাহিত করে।
সীমান্তে এই হত্যাকান্ডকে বৈধতা দেয়ার জন্য ভারতীয়রা বরাবরই নানা যুক্তি তুলে ধরে আসছে। তারা অনেক সময় বলে বেড়ায় নেহায়েত আত্মরক্ষার জন্যই সীমান্তরক্ষীরা গুলী চালাতে বাধ্য হয়। নচেৎ তারা কখনো গুলী করে না। তবে ভারতীয় এই কর্তা ব্যক্তিদের বক্তব্য যে কতটা মিথ্যাচার আর সত্যের অপলাপ তার প্রমাণও পাওয়া যায় মাসুম অধিকার ও হিউম্যান রাটস'র পরিচালিত জরিপের ঐ গবেষণা প্রতিবেদনে। তিনটি সংস্থার যৌথভাবে পরিচালিত ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে গত এক দশকে সীমান্তে নিহত হয়েছে এমন একজনেরও পরিচয় পাওয়া যায়নি যিনি সীমান্ত পার হতে গিয়ে কোন অস্ত্র বহন করেছেন। প্রতিবেদনে এই তথ্যটিই এসেছে যে বড়জোর তার হাতে হয়তো একটি লাঠি বা কাস্তে ছিল। সংগঠন তিনটি সীমান্তে নিরীহ মানুষের ওপরে বিএসএফ'র বিরুদ্ধে নির্যাতন চালানোরও অভিযোগ উত্থাপন করেছেন।

http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=57059

সীমান্তে বিএসএফ যেভাবে বাংলাদেশী হত্যা করছে

অলিউল্লাহ নোমান
নানা কৌশলে সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা করছে বিএসএফ। বন্দুকের গুলির পাশাপাশি পাথর নিক্ষেপ করে এবং পিটিয়েও বাংলাদেশী হত্যা করা হচ্ছে। সীমান্তে পাখির মতো মানুষ হত্যা করছে বিএসএফ। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন ও মানবাধিকারের কোনো তোয়াক্কা করছে না তারা। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের সীমান্তে এত মানুষ খুন হয় না। শুধু খুন নয় ভূমি দখলেও মরিয়া ভারত।চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সীমান্তে বিএসএফের হাতে ১৭ জন বাংলাদেশী নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এর বাইরে চলতি মাসের প্রথম ৬ দিনে আরও ২ জন বাংলাদেশীকে বিএসএফ হত্যা করেছে। ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত বিএসএফের নির্যাতনে গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ৪৯ জন বাংলাদেশী নাগরিক। অপহরণ করা হয়েছে ৫ জনকে। সর্বশেষ গত ২ জুলাই সিলেটের ভোলাগঞ্জ সীমান্তে এক যুবককে গুলি করে এবং ৩০ জুন লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্তে এক যুবককে পাথর ছুড়ে হত্যা করা হয়। ভারত বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা করবে না বলে বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও রক্ষা করছে না। গত ২৪ মার্চ জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২৬ মাসে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ১৩৬ জন বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১৭০ জন। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তথ্য অনুযায়ী ২০১১ সালেও বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে আগের বছরগুলোর মতোই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। মানুষ খুন হচ্ছে, পিটিয়ে মারা হচ্ছে এমনকি বিষাক্ত ইনজেকশনও দেয়া হচ্ছে বাংলাদেশীদের। গত ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তের ৯৪৭ আন্তর্জাতিক সীমানা পিলারের কাছ দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরার সময় ফেলানী খাতুন (১৫) নামে এক কিশোরীকে বিএসএফ গুলি করে হত্যা করে। পাঁচ ঘণ্টা তার লাশ সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলন্ত অবস্থায় রাখার পর ভারতে নিয়ে যায়। ত্রিশ ঘণ্টা পর বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের কাছে ফেলানীর লাশ হস্তান্তর করে বিএসএফ। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫ দিনব্যাপী বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে ১২ মার্চ অনুষ্ঠিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বিএসএফের মহাপরিচালক রমন শ্রীবাস্তব বলেন, ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে স্পর্শকাতর কিছু স্থানে প্রাণঘাতী নয়, এমন আগ্নেয়াস্ত্র দেয়া হবে। এটি পরীক্ষামূলক সিদ্ধান্ত। এতে সফল হলে দুই দেশের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্তে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে। বিএসএফ মহাপরিচালকের এই বক্তব্যের পর গত ১৮ এপ্রিল সাতক্ষীরা জেলার গাজীপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বসন্তপুর গ্রামের মনসুর আলীর ছেলে রেকাতুল ইসলাম (১৭) নিহত হয়। গত ৭ মে দিনাজপুর সদর উপজেলার খানপুর গ্রামের ফয়জুর রহমানের ছেলে হাফিজুর রহমানকে (৩০) সুন্দরা বিওপির প্রধান পিলার ৩১৬-এর সাব পিলার-৪ এর বিপরীতে বিএসএফ সদস্যরা গুলি করে হত্যা করে। এছাড়া বিএসএফ নির্যাতনের নতুন পদ্ধতি হিসেবে বাংলাদেশীদের শরীরে ইনজেকশনের মাধ্যমে পেট্রল ঢুকিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ১৬ জুন যশোর জেলার শার্শা উপজেলার ধান্যখোলা গ্রামের শাহীন, শরিফুল ইসলাম ও মুলফিক্কারকে বিএসএফ আটক করে হকিস্টিক ও লাঠি দিয়ে পিটিয়ে তাদের শরীরে ইনজেকশনের মাধ্যমে পেট্রল ঢুকিয়ে দেয়। এদিকে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৮৩৮ নম্বর মেইন পিলারের কাছে মিজানুর রহমান নামে ২৮ বছরের এক যুবককে ২৮ জুন পাথর ছুড়ে হত্যা করা হয়। ভারতের ১০৪ বিএসএফের বিএসবাড়ি ক্যাম্পের টহল সদস্যদের ছোড়া গুলিতে মিজানুর রহমান নিহত হয়। বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরেই তাকে পাথর ছোড়া হয়। সীমান্তে বিএসএফের এই আক্রমণের ভয়ে এখন কৃষকরা চাষাবাদ করতেও ভয় পায়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করলেও গুলি করে বা পিটিয়ে হত্যার বিধান পৃথিবীর কোনো দেশে নেই। সীমান্ত অতিক্রম করলে প্রত্যেক দেশেই পাসপোর্ট আইনে মামলা করার বিধান রয়েছে। কিন্তু ভারত এই বিধানের তোয়াক্কা করে না। বাংলাদেশী নাগরিককে সীমান্তের কাছাকাছি দেখলেই গুলি করছে। রাতে কোনো কোনো সীমান্তে কারফিউ জারি থাকে।

Wednesday, 29 June 2011

সিলেট সীমান্তে জনতার প্রতিরোধে এবার রক্ষা পেল ৫০ একর ভূমি : প্রতিবাদকারীদের বিএসএফের হুমকি, বিজিবিকে দেখা যায়নি














মো. দেলোয়ার হোসেন, জৈন্তাপুর (সিলেট)
সিলেট সীমান্তে জনতার প্রতিরোধের মুখে এবার রক্ষা পেল বাংলাদেশের ৫০ একর জমি। জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার পাদুয়া সীমান্তের সোনারহাট মনাইকান্দি, কুলুমছড়া এলাকায় ১২৬৪নং পিলারের ৪-এস থেকে ১২৬৬নং পিলারের ১-এস পর্যন্ত গতকাল প্রায় ৫০ একর ভূমি ভারতকে সমজিয়ে দেয়ার কথা ছিল। এরই লক্ষ্যে বাংলাদেশের পক্ষে সহকারী পরিচালক (জরিপ) দবির উদ্দিন, ভারতের পক্ষে সানক্লিনের নেতৃত্বে উভয় দেশের ১৫-২০ জন জরিপ প্রতিনিধি দল ১২৬৪নং পিলারের ৪-এস থেকে জরিপ কাজ শুরু করে। দুপুর ১২টায় কুলুমছড়া গ্রামের ৫ শতাধিক জনতা জরিপ কাজে বাধা দেন। জরিপ বিষয়ে জানতে চাইলে জরিপ টিম এলাকাবাসীকে বলে, এখানে কতটুকু ভূমি আছে এ বিষয়ে জরিপ কাজ হচ্ছে। স্থানীয় জনতা আগে থেকে জানতে পেরেছেন—জরিপ করে বাংলাদেশের প্রায় ৫০ একর ভূমি ভারতকে বুঝিয়ে দেয়া হবে। এরই প্রতিবাদে গ্রামবাসী জরিপ কাজে বাধা দেন। তখন বিএসএফ গ্রামবাসীকে তাড়া করতে থাকে। একপর্যায়ে বিএসএফ বাংলাদেশের ৫০ গজ ভেতরে প্রবেশ করলে জনতা আরও বেশি উত্তেজিত হন এবং বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে মিছিল করতে থাকেন। সীমান্তের ধারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে জীবনের বিনিময়ে ভূমি রক্ষা করার জন্য মানবপ্রাচীর গড়ে তোলেন সীমান্তবাসী। কিন্তু বাংলাদেশের সীমান্ত প্রহরী বিডিআরের নতুন নামধারী বডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি সদস্যদের তখন ওই এলাকায় দেখা যায়নি। এর আগে গত শনিবার (১৮ জুন) সিলেটেরই তামাবিল সীমান্তে একইভাবে গণপ্রতিরোধের মুখে বাংলাদেশের ভূখণ্ড যৌথ জরিপের নামে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়।গত ডিসেম্বর থেকে সীমান্তে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য সীমান্ত পিলার পরিদর্শন, অপদখলীয় ভূমি চিহ্নিতকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভারত-বাংলাদেশ জয়েন্ট বাউন্ডারি ওয়ার্কিং গ্রুপের যৌথ জরিপ কাজ শুরু হয়। ভারতীয় বিএসএফ ও নাগরিকরা বিভিন্ন সময়ে নানা অজুহাতে জরিপ কাজে বাধা দেয়। গত ৬ মাস ধরে একাধিক বৈঠকের পর জরিপ কাজ করতে দেয়নি ভারতীয় নাগরিকরা। গত ২ ও ৩ জুন ভারতীয় হাইকমিশনার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জয়েন্ট সেক্রেটারি পর্যায়ে বৈঠকের পর আবার জরিপ কাজ শুরু হয়। এই বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা আজও সীমান্তবাসী জানেন না। সীমান্তবাসী, বিজিবি ও প্রশাসনকে আড়াল করে উচ্চপর্যায়ের জরিপ টিম ভারতকে বাংলার ভূখণ্ড তুলে দিতে এই জরিপ কাজ করছে বলে সীমান্তবাসী জানান। কুলুমছড়া এলাকার আজিজুর রহমান, জলিল মিয়া, আবদুল কাদির, মুখলেছ মিয়াসহ শতাধিক গ্রামবাসী এই প্রতিবেদককে জানান, ব্রিটিশ আমল থেকে আমরা এই এলাকায় বসবাস করে আসছি। ফসলাদি ফলানো আমাদের প্রধান কাজ। কিন্তু গত দু’বছর ধরে ভারতীয় বিএসএফের বাধার ফলে আমরা কৃষিকাজ করতে পারছি না। তারা আরও জানান, ১৯৫২ সালে ও ২০০২ সালে সীমান্তের জরিপ কাজ হয়। সীমান্তের এই ভূমিগুলো এলাকার বিভিন্ন ব্যক্তি ও সরকারের নামে রেকর্ডভুক্ত আছে। এলাকাবাসী আরও জানান, ভারতীয় নাগরিক ও বিএসএফ বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকা মসজিদ, মাদরাসা, কবরস্থান, কৃষিজমি ও ফসলাদি দখল করে নিতে চায়। ভারতীয় এই আগ্রাসী তত্পরতা সীমান্তবাসী জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করবেন। এলাকাবাসীর বাধার মুখে জরিপ না করে উভয় দেশের জরিপ দল ফিরে চলে যায়। এ বিষয়ে জরিপ টিমের সঙ্গে আলাপকালে তারা কোনো কথা বলতে রাজি নয় বলে জানান। তারা বলেন, উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে

জয়পুরহাটে আরও একজন নিহত : বিএসএফের উপর্যুপরি খুন

পাঁচবিবি (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি
জয়পুরহাটের পাঁচবিবির নন্দাইল সীমান্তে গতকাল ভোরে বিএসএফের গুলিতে ফজলু মিয়া (৩৯) নামে আরও এক গরু ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। নিহত ফজলু জেলার পাঁচবিবি উপজেলার নন্দাইল গ্রামের কফিল উদ্দিনের ছেলে। মাত্র একদিন আগে বেনাপোলের ধান্যখোলা সীমান্তে আবদুুল আলিম (৩৫) নামে আরেক বাংলাদেশী গরু ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করে বিএসএফ।
জয়পুরহাট-৩ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধীন হাটখোলা সীমান্ত ফাঁড়ির নায়েব সুবেদার জাহাঙ্গীর আলম ও এলাকাবাসী জানায়, ভোর ৪টার দিকে ভারত সীমান্তের ২৭৯-এর ১৮ সাব-পিলার এলাকার কাঁটাতারের বেড়ার বাইরে দিয়ে ভারতীয় গরু ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের গরু দিতে আসে। বাংলাদেশী গরু ব্যবসায়ীরাও সেখানে যায়। এ সময় ভারতের সিঁধাই ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা ২ রাউন্ড গুলি ছুড়ে। তাদের গুলি ফজলু মিয়ার (৩৯) গলায় বিদ্ধ হলে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। পরে বিএসএফ লাশটি ভেতরে নিয়ে যায়। বিজেবির হাটখোলা সীমান্ত ফাঁড়ি লাশ ফেরত চেয়ে ও এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বিএসএফের সিঁধাই ক্যাম্পে একটি পত্র পাঠানো হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

Tuesday, 31 May 2011

ফারাক্কার মারাত্মক প্রভাব : ৫৩ নৌরুট বন্ধের উপক্রম













ইলিয়াস খান
ফারাক্কার ভয়াবহ প্রভাব এবার দেশের নদ-নদীর ওপর পড়তে শুরু করেছে। একের পর এক নদী শুকিয়ে যাওয়ায় চলাচলের মূল মাধ্যম নৌরুটগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিটিএ) এ পর্যন্ত দেশের ৫৩টি নৌরুটকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দ্রুত এসব নৌরুটে ড্রেজিং কাজ শুরু করা না হলে নৌ-যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব রুট সচল রাখতে এরই মধ্যে ১১ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে একনেকে। এ বিষয় নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবদুল মান্নান হাওলাদার বলেন, প্রাথমিকভাবে ৫৩টি নৌরুট চিহ্নিত করা হয়েছে। এজন্য ১১ হাজার কোটি টাকার একটি প্রস্তাবনা তৈরি করে আমরা একনেকে পাঠিয়েছি। প্রকল্পটি পাস হলে নৌরুটগুলোকে সাবেক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতিসহ প্রকল্পটির আওতায় ৩টি ড্রেজার ২০১১ সালের এপ্রিল-মের মধ্যে পাওয়া যাবে। এছাড়া অন্যান্য সহায়ক জলযান ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহের কাজ আগামী জুনের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করছি।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বিআইডব্লিউটিএ’র সংরক্ষণ, খনন কর্মসূচির আওতায় নৌ-চলাচলে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ ফেরি ও নৌরুটগুলোর নাব্য অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নৌপথগুলোর নাব্য উন্নয়ন কল্পে ৫৩টি নৌপথে ৯ বছর মেয়াদি ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনার আওতায় আড়িয়াল খাঁ ও কুমার নদীভুক্ত মাদারীপুর-চরমুগুরিয়া-টেকেরহাট-গোপালগঞ্জ নৌপথের নাব্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে মাদারীপুর-চরমুগুরিয়া-টেকেরহাট-গোপালগঞ্জ-নৌপথে ড্রেজিং শীর্ষক একটি প্রকল্প ২৫ জানুয়ারি একনেক অনুমোদন দিয়েছে এবং বাস্তবায়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া ১ম পর্যায়ে ২৪টি নৌপথে ক্যাপিটাল ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অভ্যন্তরীণ নৌপথের ৫৩টি রুটে ক্যাপিটাল ড্রেজিং (১ম পর্যায় ২৪ নৌপথ) শীর্ষক একটি প্রকল্প ১২টি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ড্রেজিং শীর্ষক অপর একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। সূত্র জানায়, ৫৩টি রুটে ক্যাপিটাল ড্রেজিং (১ম পর্যায় ২৪ নৌপথ) প্রকল্পের ডিপিপির ওপর পরিকল্পনা কমিশনে ২০১০ সালের ২২ আগস্ট পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ড্রেজিং দরপত্র পুনর্নির্ধারণ পূর্বক ডিপিপি পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠন শেষে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে ২৭ জানুয়ারি প্রকল্পের ওপর এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিপিপি পুনর্গঠন করে ৩ মার্চ নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় যা অনুমোদন প্রক্রিয়াধীনের নিমিত্তে ৩ এপ্রিল পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে যে ২৪টি রুট ড্রেজিংয়ের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে— ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ-গজারিয়া-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম-রুট, চাঁদপুর-হিজলা-বরিশাল রুট, গাশিয়াখালী-বরিশাল- কালিগঞ্জ-চাঁদপুর-আরিচা নৌরুট, ভৈরব বাজার-লিপসা-চটক-সিলেট নৌরুট, গাজলাজর-মোহনগঞ্জ রুট, লোয়ারগা- দুলোভপুর রুট, চিটরি-নবীনগর-কুটিবাজার নৌরুট, নরসিংদী-কাটিয়াদী নৌরুট, নরসিংদী-মরিচাকান্দি-সেলিমগঞ্জ-বাঞ্জারামপুর-হোমনা নৌরুট, দাউদকান্দি- হোমনা-রামকৃষ্ণপুর রুট, চাঁদপুর-ইচুলি-ফরিদগঞ্জ রুট, বরিশাল-ঝালকাঠি-পাথরঘাটা নৌরুট, খুলনা-গাজিরহাট- মানিকদা রুট, নন্দীবাজার-মাদারীপুর নৌরুট, দিলালপুর-গৌরাদিঘার-চামড়াঘাট-নীলকিয়াটপাড়া-নেত্রকোনা রুট, মনুমুখ-মৌলভীবাজার নৌরুট, মিরপুর-সাভার নৌরুট, শ্রীপুর-ভোলা খেয়াঘাট-গঙ্গাপুর-ভোলা নৌরুট, চৌকিঘাটা- কালীগঞ্জ রুট, পটুয়াখালী-মীর্জাগঞ্জ রুট, হোসনাবাদ-টরকী-ফাঁসিতলা নৌরুট এবং দালারচর-বালিয়াকান্দি-বোয়ালমারী- কাশিয়ানি নৌরুট। অপর যে ১২টি নৌপথ ড্রেজিংয়ের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে সেগুলো হলো— ঢাকা-তালতলা-ডহুরী, জারিরা-মাদারীপুর-কবিরাজপুর-চৌধুরীর হাট-পিজাখালি-চরজানাজাত-কেওড়াকান্দি নৌরুট, লাহার হাট-ভেদুরিয়া নৌরুট, শাহেবের হাট-টুঙ্গিবাড়ী-লাহার হাট রুট, ঢাকা সদর ঘাট-ভিরুলিয়া-পাটুরিয়া-বাগাবাড়ী রুট, ডেমরা-ঘোড়াশাল-পলাশ রুট, ঢাকা-রামচর-মাদারীপুর নৌরুট, ঢাকা-শরিয়তপুর নৌরুট, চাঁদপুর-নন্দীরবাজার-শিকারপুর- হুলারহাট রুট, হুলারহাট-চরচাপালি-গোপালগঞ্জ রুট, নারায়ণগঞ্জ-দাউদকান্দি রুট এবং ঢাকা-সুরেশ্বর- আঙ্গারিয়া-মাদারীপুর-নৌরুট। এ বিষয়ে লঞ্চ মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সুন্দরবন নেভিগেশনের স্বত্বাধিকারী সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, আশ্বাসের বাণী বহু শুনেছি এখন চাই বাস্তবায়ন। ৩টি নতুন ড্রেজার আনা হবে এমনটা শুনতে শুনতে কান ব্যথা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু বাস্তবায়ন দেখতে পাচ্ছি না। দক্ষিণাঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষ এখনও নৌপথে যাতায়াতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অল্প খরচে তারা ঢাকা-বরিশাল রুটে যাতায়াত করেন। কিন্তু দেশের বেশিরভাগ বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের নৌরুটগুলো বন্ধ হয়ে যেতে বসেছে। বরিশালে গত ৩০ বছরে ২৭টি নৌরুট বন্ধ হয়ে গেছে। সরকার অনতিবিলম্বে ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা না করলে সব নৌরুট যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, দেশে যে ড্রেজারগুলো আছে তার বেশিরভাগ যেখানে প্রয়োজন নেই সেখানে ফেলে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ কার্গো মালিক সমিতি অ্যাসোসিয়েশনের বরিশাল বিভাগীয় সম্পাদক মো. ইউনুচ বলেন, ভাষানচর- গাশিয়াখালি-সন্ন্যাসী-চরমোনাইসহ বিভিন্ন রুটে প্রায়ই আটকা পড়ে জাহাজগুলো। পর্যাপ্ত ড্রেজিং ব্যবস্থা না থাকায় চর পরে ভরে যাচ্ছে বেশিরভাগ নৌরুট। সরকার এখনই ব্যবস্থা না নিলে অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হবে লঞ্চ ও কার্গো মালিকরা